নরিন জাহান, জেলা প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ:
শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পকারখানার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সুপেয় পানির চাহিদা। নগরবাসীর জন্য নিরাপদ, বিশুদ্ধ ও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। দীর্ঘদিনের পানি সংকট, পুরোনো পাইপলাইন, পানির অপচয় এবং নদীদূষণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবার বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এ লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় নেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬৯৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ‘নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০৩১ সালের মার্চ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ১১ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে।
প্রকল্পের আওতায় পুরোনো ও জরাজীর্ণ পানির পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, নতুন সরবরাহ লাইন স্থাপন, বিদ্যমান পানি শোধনাগারের উন্নয়ন এবং পানির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক ১১ কোটি ৩০ লাখ লিটার পানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়িয়ে ১৬ কোটি ২০ লাখ লিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে অন্তত চার লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
শুধু পানির উৎপাদন বাড়ানো নয়, পানির অপচয় কমানোও এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। প্রায় ২৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন প্রতিস্থাপন ও সম্প্রসারণ, মিটারযুক্ত সংযোগ এবং আধুনিক ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পানির অপচয় ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অনলাইন বিলিং ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।
তবে নারায়ণগঞ্জের পানিখাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে মিশে পানির স্বাভাবিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। গত ৫ নভেম্বর শিল্পবর্জ্যে শীতলক্ষ্যা নদী দূষণের কারণে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এ পরিস্থিতিতে শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) কার্যকর রাখা, নিয়মিত নদীর পানির গুণগত মান পরীক্ষা, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। কারণ নদীর পানি দূষণমুক্ত না হলে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্য অর্জনও কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে ভবিষ্যতের পানির চাহিদা বিবেচনায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিশোধিত ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এডিবির প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় ভূপৃষ্ঠের পানির অংশ ৫১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২২ কিলোমিটার ড্রেনেজ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানো ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের পানিখাতে উন্নয়নের একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে কাজ বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পানির গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, পরিকল্পনা যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি এলাকায় সমান পানির চাপ, বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং সাশ্রয়ী সেবার বাস্তব প্রতিফলন ঘটুক।
নারায়ণগঞ্জের পানিখাতে এখন প্রয়োজন শুধু নতুন অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন টেকসই ও জনবান্ধব ব্যবস্থাপনা। সঠিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হলে শীতলক্ষ্যাকে ঘিরেই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ পানির নতুন সম্ভাবনার নারায়ণগঞ্জ।
এ জাতীয় আরো খবর..