বিশেষ প্রতিনিধি:
পোশাকশিল্পে বর্তমানে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে, তা কোনো স্বাভাবিক বা ন্যায়সঙ্গত শ্রমিক আন্দোলন নয়। মূলত সাধারণ পোশাকশ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার লক্ষ্যে এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক সহিংসতা, গভীর ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ এক আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের অমীমাংসিত বা পাওনা কোনো দাবিদাওয়া অবশিষ্ট নেই, অথচ একটি চিহ্নিত চক্রান্তকারী মহল তৈরি পোশাকখাতে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁতারা করছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতার সঙ্গে সাধারণ কোনো শ্রমিকের সংশ্রব নেই; বরং শ্রমিক আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে কিছু বহিরাগত ও অপ্রাপ্তবয়স্ক-অশ্রমিক ব্যক্তি হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করে বলেন, সরকারের প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, অতীতে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন পোশাক কারখানার মালিক, প্রাক্তন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ভূমিকা এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। এর পাশাপাশি মাফিয়া ও উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী দেশকে অস্থিতিশীল করতে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পরিচালিত চক্রান্ত বাস্তবে রূপ দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। সরকার এ জাতীয় রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা কঠোর হাতে দমনের স্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের অন্যতম মূল দাবি ছিল প্রতি তিন বছর অন্তর নতুন সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণের উদ্দেশ্যে একটি নিরপেক্ষ মজুরি বোর্ড গঠন করা। সরকারের তরফ থেকে নির্ধারিত সময়ের যথেষ্ট আগেই মজুরি বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নাম দিতে কিছুটা বাড়তি সময় নেওয়ায় বোর্ড গঠনে সামান্য বিলম্ব হলেও, নাম পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে এর প্রথম সভাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সিনিয়র জেলা জজ পদমর্যাদার একজন যোগ্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি, বিরাজমান অর্থনৈতিক অবস্থা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যয় বিবেচনা করে আগামী ১ জানুয়ারি (২০২৭) থেকে নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই এই বোর্ড নিবিড়ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত শ্রমবান্ধব, শ্রমিকদের কল্যাণকামী ও শিল্পবান্ধব ব্যক্তিত্ব। তিনি শ্রমিকদের সার্বিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও অধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিষয়গুলো বিবেচনার দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশের সার্বিক রপ্তানি বৃদ্ধি করা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র উন্মোচন করা।
তিনি জানান, সম্প্রতি তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সঙ্গে সরকারের দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং শ্রমিকনেতাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে বিস্তারিত মতবিনিময় করা হয়েছে। উভয় পক্ষই একমত হয়ে স্বীকার করেছেন যে, এ ধরনের অপপ্রয়াস ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সাধারণ শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হতে পারে না; বরং কায়েমি স্বার্থ ও নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতেই শ্রমিকদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সরকার অত্যন্ত ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ও স্পষ্ট আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা কোনো অবস্থাতেই ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি বা বল প্রয়োগ’ না করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য গুরুতর জখম হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও তাঁরা সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করেছেন এবং শ্রমিকদের প্রতি বলপ্রয়োগ করা থেকে বিরত থেকেছেন। তবে এই উদাহরণের সুযোগ নিয়ে মাফিয়া ও অপরাধী চক্রকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
সার্বিক দিক বিবেচনা করে মন্ত্রী সাধারণ তৈরি পোশাকশ্রমিকদের কোনো ধরনের উসকানি বা গুজবে কান না দিয়ে অবিলম্বে নিজ নিজ কারখানায় ও কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আকুল আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শ্রমিকেরা স্বাভাবিক কাজে ফিরে এলে উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল থাকবে এবং শ্রমিকদের নিজস্ব জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতি সুরক্ষিত থাকবে।
সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটক সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যদি তিনি পুলিশ হেফাজতে আটক হয়ে থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো আইনগত অভিযোগ থাকার কারণেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং বিষয়টি বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
উক্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।