মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি:
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ এবং উদীয়মান অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বিশ্ব রাজনীতির বড় বড় পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রই নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন এক জায়গায়, যা একদিকে দক্ষিণ এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত করেছে, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত মোহনায় এর অবস্থান একে সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় দিক থেকেই অনন্য করে তুলেছে। বঙ্গোপসাগর কেবল আঞ্চলিক বাণিজ্যের রুট নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান পথগুলোরও অন্যতম। এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ বা অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত নজরে রয়েছে এই জনপদ।
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে (Indo-Pacific Strategy) কার্যকর করতে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে মুক্ত ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি জোরালো করা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করাই মার্কিন নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বেইজিংয়ের ‘বেলট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাংলাদেশ। দেশের বড় বড় মেগা প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর নির্মাণ এবং প্রযুক্তির বাজারে চীনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ রয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার আড়ালে চীন এই অঞ্চলে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও নৌ-কৌশলগত অবস্থান সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট।
ভারতের কাছে বাংলাদেশ কেবল নিকটতম প্রতিবেশীই নয়, বরং নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশীদার। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশের সহযোগিতা অপরিহার্য। তাই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নয়াদিল্লি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ঢাকার সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
বাংলাদেশের সামনে একদিকে যেমন বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের অপার সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে পরাশক্তিগুলোর এই শীতল লড়াই বা রেষারেষির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এক বিরাট কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’—এই নীতি বজায় রেখেই বাংলাদেশকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে পোশাক শিল্প, ওষুধ খাত এবং শ্রমবাজারের স্থায়িত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই জটিল সমীকরণ নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা জরুরি।
বাংলাদেশ আজ আর পরনির্ভরশীল কোনো দেশ নয়, বরং উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে আগামী দিনে পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে না পড়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে বিচক্ষণ কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে এই বিশ্ব রাজনীতির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এক লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..