নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে চোরাচালানের মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে নিয়ে আসা ১৭টি ভারতীয় ষাঁড় বাছুরসহ আন্তঃজেলা চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় গরু পরিবহনে ব্যবহৃত একটি পিকআপ ভ্যান এবং চাঁদাবাজি বা খাস আদায়ের কাজে ব্যবহৃত জাল জালিয়াতির একটি ভুয়া রশিদ বই জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত ১৭টি ষাঁড় বাছুরের আনুমানিক বাজারমূল্য ৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভোরের দিকে দুর্গাপুর-শ্যামগঞ্জ সড়কের উত্তরাইল বাজারসংলগ্ন দয়ালবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে পিকআপসহ চারজনকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাদের দেওয়া তথ্য ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে নাজিরপুর বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয় থেকে চক্রের অপর এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন—নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ফুলপুর গ্রামের পারভেজ মিয়া (২৫), নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বীরকান্দি গ্রামের আফসার উদ্দিন (৩৪), দুর্গাপুরের চারিখাল গ্রামের হানিফ (৩০), নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বীরকান্দি গ্রামের ইয়াসিন মিয়া (২২) এবং কলমাকান্দার নাজিরপুর এলাকার রামপুর গ্রামের জাহিদ হাসান রাসেল (৩০)।
পুলিশের এজাহার ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত শুক্রবার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে দুর্গাপুর থানার এসআই মো. মনিরুল ইসলাম সংঙ্গীয় ফোর্সসহ সোমেশ্বরী সেতুর ওপর চেকপোস্টে অবস্থান করছিলেন। এ সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে যে, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধভাবে সংগৃহীত ভারতীয় গরু একটি পিকআপে বোঝাই করে নাজিরপুর মোড় হয়ে দুর্গাপুর-শ্যামগঞ্জ সড়ক দিয়ে পাচার করা হচ্ছে।
প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সেতুর ওপর তাৎক্ষণিকভাবে চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজন পিকআপটিকে থামার সংকেত দেয়। তবে চালক পুলিশের সংকেত অমান্য করে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলযোগে পিকআপটির পিছু ধাওয়া করেন। দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া করার একপর্যায়ে সকাল সোয়া ৫টার দিকে উত্তরাইল বাজারের দয়ালবাড়ী এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ পিকআপটি আটক করতে সক্ষম হয় এবং গাড়িতে থাকা চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
পরবর্তীতে আটককৃত পিকআপটিতে তল্লাশি চালিয়ে বিভিন্ন রঙ ও আকৃতির মোট ১৭টি ষাঁড় বাছুর উদ্ধার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে গরুগুলোর বৈধ কোনো আমদানি কাগজপত্র বা মালিকানার প্রমাণপত্র দেখতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কলমাকান্দার ‘নাজিরপুর বাজার’ নামসংবলিত হাতে লেখা ১৭ পাতার হলুদ রঙের কিছু কাগজ প্রদর্শন করেন। তবে পুলিশের নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ে সেই কাগজগুলো বৈধ বা আইনসম্মত কাগজপত্র হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রমাণিত হয়। এরপর পুলিশ গরু ও পিকআপটি জব্দ করে।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে মামলার ৫ নম্বর আসামি জাহিদ হাসান রাসেলের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সীমান্তবর্তী বিভিন্ন রুট দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে নিয়ে আসতেন। পরবর্তীতে নাজিরপুর বাজারের জাল ও ভুয়া খাস আদায়ের রশিদ ব্যবহার করে এসব গবাদিপশু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করে আসতেন।
তাদের দেওয়া এই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে গত শুক্রবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে নাজিরপুর বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির নিজস্ব কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে জাহিদ হাসান রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার হেফাজত তল্লাশি করে নাজিরপুর বাজারের নামসংবলিত ১০৯ পাতার একটি ভুয়া খাস আদায়ের রশিদ বই জব্দ করা হয়, যার বিভিন্ন পাতায় ০৪০১ থেকে ০৫০০ পর্যন্ত ক্রমিক নম্বর উল্লেখ ছিল।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার সাকের আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, জব্দকৃত ১৭টি ভারতীয় ষাঁড় বাছুরের আনুমানিক বাজারমূল্য ৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এছাড়া গবাদিপশু পরিবহনে ব্যবহৃত কুষ্টিয়া-ন-১১-০০২৫ নম্বরের পিকআপটির আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা।
এই ঘটনায় চোরাচালানের মাধ্যমে ভারতীয় গরু সংগ্রহ, অবৈধ উপায়ে সংরক্ষণ ও বিক্রির উদ্দেশ্যে জাল রশিদ প্রস্তুত এবং ব্যবহারের অপরাধে গ্রেপ্তারকৃত পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং দণ্ডবিধির ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।