শাজাহান আহমেদ আসিফ, নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি:
নরসিংদীর মাধবদী—দেশের অন্যতম বড় কাপড় ও সুতা বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সুতা ও কাপড়ের বেচাকেনা হয় এ বাজারে। তবে এই ব্যস্ত বাজারেই দীর্ঘদিন ধরে উঠছে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা স্থানীয় বাজারে বিক্রির অভিযোগ। বিশেষ করে ৮০ কাউন্টের চায়না সুতা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা।
অভিযোগ রয়েছে, পোশাক কারখানার জন্য বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা সুতা নির্ধারিত ব্যবহারের বাইরে বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে চলে আসছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন দেশীয় সুতা উৎপাদনকারীরা।
মাধবদী বাজারে এমন অভিযোগের সঙ্গে কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে সুবোধ বাবুর মডার্ন ট্রেডার্স, বিনয় দেবনাথের আনন্দ ট্রেডিং, সারওয়ার ট্রেডার্স ও দোলন ট্রেডিং।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনো সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই সাপেক্ষ। সাংবাদিকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তাঁদের সুতা কেনাবেচা, আমদানি ও মজুতের বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাইলে তা দেখাতেও অনীহা দেখা যায়। ফলে অভিযোগের পাশাপাশি সামনে এসেছে আরও একটি প্রশ্ন—ব্যবসায়িক লেনদেন ও পণ্যের বৈধতার নথি থাকলে সেগুলো প্রকাশ করতে আপত্তি কোথায়?
অভিযোগের বিষয়ে দোলন ট্রেডিংয়ের ম্যানেজার চন্দ্র বলেন—আমরা এগুলো বিক্রি করি না, আমরা সব বাংলাদেশি সুতা বিক্রি করি।
তাঁর দাবি, তারা স্থানীয় সুতা নিয়েই ব্যবসা করেন। তবে সাংবাদিকরা তাঁদের গুদাম, মজুত পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো নথি দেখাননি। গুদাম সম্পর্কে জানতে চাইলে উল্টো তিনি সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন রাখেন—গুদামের তথ্য দিয়ে কী হবে।
অন্যদিকে আনন্দ ট্রেডিংয়ের মালিক বিনয় দেবনাথ অভিযোগকে সরাসরি অস্বীকার করে বলেন—
যারা বলে আমি বন্ডের সুতা বিক্রি করি, তারা হয়তো হিংসা করে আমার নামটা দিয়েছে। আসলে এটার সঙ্গে আমি জড়িত না। বন্ডের জিনিস আমরা বিক্রি করি না।
তাঁর দাবি, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় সুতা বিক্রি হয় এবং বন্ডের পণ্য বিক্রির সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যের পাশাপাশি ব্যবসায়িক নথিপত্র যাচাই করা গেলে প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হওয়ার কথা।
এখন প্রশ্ন—যদি এসব প্রতিষ্ঠানে বন্ডের সুতা বিক্রি না হয়, তাহলে মাধবদী বাজারে এমন সুতার উপস্থিতি নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠছে কেন? আর অভিযোগে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম আসছে, তাঁদের ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব, আমদানি কাগজপত্র ও মজুতের তথ্য কী বলছে?
সম্প্রতি মাধবদীর বিরামপুরে একটি ভ্যান থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ পাউন্ড ওজনের ২০ কার্টন চায়না সুতা জব্দের ঘটনাও সামনে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, পণ্যটির উৎস ও আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনাটি বাজারে বন্ডের সুতা নিয়ে চলমান আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
এ বিষয়ে মাধবদী বাজার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী বলেন, পোশাক কারখানাগুলো বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে সুতা আমদানি করে। কিন্তু সেই সুতা যদি নির্ধারিত ব্যবহারের বাইরে বাজারে বিক্রি হয়, তাহলে দেশীয় সুতা শিল্প ক্ষতির মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ৮০ কাউন্টের সুতার ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা গেলে দেশের স্পিনিং মিলগুলো আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে তিনি সবাইকে অবৈধ ব্যবসা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
তবে পুরো বিষয়টির প্রকৃত চিত্র জানতে এখন প্রয়োজন অভিযোগ নয়, নথিপত্রের অনুসন্ধান।
কারা বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি করছে? কোন প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি হচ্ছে? বিল অব এন্ট্রি ও বন্ডের কাগজপত্রে কী তথ্য রয়েছে? শুল্ক-কর পরিশোধ করা হয়েছে কি না? আর কারখানার জন্য আমদানি করা সুতা শেষ পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছাচ্ছে মাধবদী বাজারে?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কাস্টমসের নথি, বন্ড লাইসেন্স, আমদানি কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব যাচাইয়ের মাধ্যমে।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু নথিপত্র দেখাতে অনীহা এবং বাজারে বন্ডের সুতা নিয়ে চলমান অভিযোগ—দুটো বিষয়ই এখন নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
মাধবদী বাজারে ৮০ কাউন্ট চায়না সুতার এই বাণিজ্য—নিয়ম মেনে হচ্ছে, নাকি বন্ড সুবিধার আড়ালে তৈরি হয়েছে আলাদা বাজার—সেই উত্তরই এখন খুঁজে দেখা জরুরি।
এ জাতীয় আরো খবর..