আল- আমিন সরকার, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে প্রযুক্তি, বদলে গেছে গান শোনার মাধ্যমও। একসময় বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল ক্যাসেট প্লেয়ার। সেই জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোন, ইউটিউব আর ডিজিটাল মিউজিক।
নতুন প্রজন্মের কাছে ক্যাসেট প্লেয়ার এখন অনেকটা অতীতের স্মৃতিচিহ্ন। তবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের মাঝেও ব্যতিক্রম সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার মো. মান্নান শেখ। বয়স ৬৭ বছর। পেশায় মুদি দোকানদার। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে আছে পুরোনো ন্যাশনাল প্যানাসনিক ক্যাসেট প্লেয়ার। এখনো দোকানে বসে সেই যন্ত্রে গান শুনে ফিরে যান ফেলে আসা দিনগুলোতে।
উল্লাপাড়া উপজেলার কাওয়াক উত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মান্নান শেখ ১৯৯১ সালে শখের বশে ছয় হাজার টাকা দিয়ে কেনেন ন্যাশনাল প্যানাসনিক RX5010F মডেলের ক্যাসেট প্লেয়ারটি। উল্লাপড়ার চঞ্চল মোহরীর ছেলের কাছ থেকে পুরোনো এই যন্ত্রটি কিনেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল গান শোনা, পাশাপাশি খবর শুনে দেশ-বিদেশের নানা ঘটনা সম্পর্কে জানা।
সেই সময় ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। পছন্দের গান শুনতে পরিচিতজনদের কাছ থেকে ক্যাসেট ধার করতেন মান্নান শেখ। পরে নিজের একটি ক্যাসেট প্লেয়ার কেনার ইচ্ছা পূরণ করেন। সেই শখ যে একদিন কয়েক দশকের সঙ্গী হয়ে উঠবে, তা হয়তো তখন ভাবেননি তিনি।
মান্নান শেখ বলেন, তখন ক্যাসেটের গান শুনতে খুব ভালো লাগত। রেডিওর শব্দের চেয়ে ক্যাসেটে গান শুনতে বেশি ভালো লাগত। পরিচিতদের কাছ থেকে ক্যাসেট ধার করে গান শুনতাম। পরে নিজের টাকায় ক্যাসেট প্লেয়ার কিনি। সেই থেকে এখনো এটি ব্যবহার করছি।
তিন যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বদলে গেছে চারপাশের জীবনযাত্রা। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনেই এখন শোনা যায় পছন্দের গান, দেখা যায় দেশ-বিদেশের খবর। কিন্তু মান্নান শেখের কাছে পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ারের আবেদন এখনো ফুরায়নি। প্রতিদিন নিজের মুদি দোকানে বসে সুযোগ পেলেই চালু করেন প্রিয় সেই যন্ত্রটি।
দোকানের এক কোণে রাখা ক্যাসেট প্লেয়ারটির পাশে রয়েছে কয়েক দশক আগের স্মৃতি জড়ানো ৫০ থেকে ১০০টি পুরোনো ক্যাসেট। সেসব ক্যাসেটে রয়েছে বিভিন্ন সময়ের জনপ্রিয় শিল্পীদের গান, দেশাত্মবোধক সংগীতসহ নানা ধরনের রেকর্ড করা শব্দ। ক্যাসেটের ফিতায় বন্দি সেই গানগুলোই যেন মান্নান শেখকে বারবার ফিরিয়ে নেয় তাঁর যৌবনের দিনগুলোতে।
পুরোনো যন্ত্রটি এখনো চালু থাকায় অনেকেই অবাক হন। কেউ কেউ মজা করে জানতে চান, এত পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ার এখনো চলে কি না। মান্নান শেখও হাসিমুখে জবাব দেন, চলতেছে তো, দেখি।
তিনি বলেন, শুরুতে কিছু টাকা খরচ হয়েছিল। এখনো মোটামুটি ভালোই চলে। মাঝে মাঝে একটু নেড়েচেড়ে দিতে হয়, তারপর ঠিক হয়ে যায়। পুরোনো দিনের জিনিস হলেও এটি বেশ টেকসই।
তবে মান্নান শেখের কাছে ক্যাসেট প্লেয়ারটি শুধু গান শোনার যন্ত্র নয়; এটি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়ের সাক্ষী। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যৌবনের স্মৃতি, শখ আর অসংখ্য ভালো লাগার মুহূর্ত। তাই প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, পুরোনো এই সঙ্গীকে ফেলে দেওয়ার কথা ভাবেননি তিনি।
আবেগভরা কণ্ঠে মান্নান শেখ বলেন, এই ক্যাসেট প্লেয়ার আমার জীবনের একটা অংশ। গান চালালে মনে হয়, আবার যেন সেই তরুণ বয়সে ফিরে গেছি।
মান্নান শেখের এই ব্যতিক্রমী অভ্যাস যেন সময়ের দুই প্রান্তকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। একদিকে স্মার্টফোনের দ্রুতগতির ডিজিটাল দুনিয়া, অন্যদিকে ক্যাসেটের ফিতায় বন্দি সুর আর স্মৃতি। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা পুরোনো দিনের সেই সংগীতযন্ত্র এখনো তাঁর দোকানে বাজে আপন ছন্দে।
ক্যাসেটের যুগ হয়তো প্রায় শেষ। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে পুরোনো দিনের জিনিস শুধু ব্যবহার্য সামগ্রী নয়, ভালোবাসা আর স্মৃতির অমূল্য সম্পদ। মান্নান শেখের ৩৬ বছরের ক্যাসেট প্লেয়ার সেই কথাই যেন আবার মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি বদলায়, সময় এগিয়ে যায়, কিন্তু মনের গভীরে জায়গা করে নেওয়া স্মৃতিগুলো কখনো পুরোনো হয় না।
এ জাতীয় আরো খবর..