×
সদ্য প্রাপ্ত:
গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী একাত্তরের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, চব্বিশ ছিল রক্ষার: প্রধানমন্ত্রী খুলনায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে: প্রধানমন্ত্রী চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোরে ভূরাজনৈতিক শঙ্কা নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী খান জাহান আলীর (রহ.) মাজার জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী একটি মহল চক্রান্ত করে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কে প্রবাসীদের গাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি: চালকসহ গ্রেফতার ৩, লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার তাহসিফ হত্যা মামলায় আবারও ৩ দিনের রিমান্ডে দীপ
  • প্রকাশিত : ২০২৬-১১-০৮
  • ১৬ বার পঠিত
মোঃ নিজাম উদ্দিনঃ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই শিল্প থেকে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের যে পরিচিতি ও সাফল্য, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান যাঁদের, তাঁরা হলেন এ দেশের লাখ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। তাঁদের ঘাম, শ্রম, ত্যাগ ও নিরলস পরিশ্রমে সচল থাকে কারখানার উৎপাদনব্যবস্থা। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যাঁদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে, তাঁদের একটি বড় অংশই আজও জীবনযাপনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই গার্মেন্টস কর্মীদের ন্যায্য বেতনের দাবি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁদের মৌলিক অধিকার।

একবার ভাবুন, একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রতিদিনের জীবন কেমন? ভোরে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের জন্য খাবার তৈরি, সন্তানদের দেখাশোনা, এরপর কর্মস্থলে ছুটে যাওয়া। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ, উৎপাদনের চাপ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য তৈরির তাগিদ—সবকিছু সামলে দিন শেষে যখন তিনি বাসায় ফেরেন, তখন শরীরজুড়ে ক্লান্তি আর মনে থাকে আগামী দিনের অনিশ্চয়তা। মাস শেষে যে বেতন হাতে পান, তা দিয়ে বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের লেখাপড়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন হলো, যাঁরা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পোশাক তৈরি করছেন, যাঁদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য এগিয়ে যাচ্ছে, তাঁরা কেন নিজেদের পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হিমশিম খাবেন?

বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে শ্রমিকদের আয় বাড়ছে কি? বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি হচ্ছে না। ফলে কাগজে-কলমে বেতন থাকলেও বাস্তবে তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একজন শ্রমিকের আয় যখন তাঁর পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না, তখন সেই বেতনকে কতটা ন্যায্য বলা যায়?

ন্যায্য মজুরি মানে শুধু বেঁচে থাকার টাকা নয়, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।

গার্মেন্টস শ্রমিকেরা বিলাসী জীবন চান না। তাঁরা চান তিন বেলা খাবার, নিরাপদ বাসস্থান, সন্তানদের ভালোভাবে লেখাপড়া করানোর সুযোগ, অসুস্থ হলে চিকিৎসার নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের জন্য সামান্য সঞ্চয়। তাঁরা চান, মাস শেষে বেতন হাতে পেয়ে যেন ধারদেনা করে সংসার চালাতে না হয়। এই চাওয়াগুলো কি খুব বেশি? একটি শ্রমনির্ভর শিল্পে যাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাঁদের জন্য ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়?

এখানে মালিকপক্ষের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা, ক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণ এবং ব্যবসায়িক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু ব্যবসায়িক মুনাফার হিসাব করতে গিয়ে শ্রমিকের জীবনমানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একটি কারখানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি বা ভবন নয়; বরং সেখানে কর্মরত দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিকেরাই প্রকৃত সম্পদ।

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে তাঁর কর্মস্পৃহা বাড়বে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা তৈরি হবে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষ জমতে থাকলে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে দূরত্ব বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত শিল্পের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত কাজের জন্য আইন অনুযায়ী ওভারটাইমের পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, বেতন সময়মতো পরিশোধ এবং উৎসব ভাতা, ছুটি ও অন্যান্য আইনগত সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই চলবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শ্রম আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া প্রকাশের গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। শ্রমিকেরা তাঁদের ন্যায্য দাবি জানাবেন, এটি তাঁদের অধিকার। তাঁদের দাবি শুনতে হবে, সমস্যাগুলো বুঝতে হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করতে হবে। শ্রমিকদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে কোনো শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। একইভাবে শ্রমিকদেরও শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে শ্রমিক, মালিক কিংবা শিল্পের ক্ষতি না হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পোশাকশিল্পের সাফল্য শুধু রপ্তানির পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনমান কতটা উন্নত হলো, তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ হলো, তাঁরা কতটা মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারছেন—এসব বিষয়ও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

যে শ্রমিকের হাতে তৈরি পোশাক বিশ্বের নামিদামি বিপণিবিতানে বিক্রি হয়, সেই শ্রমিকের নিজের সন্তানের জন্য ভালো পোশাক কেনার সামর্থ্য থাকবে না—এমন বৈপরীত্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। যে শ্রমিকের শ্রমে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে, সেই শ্রমিকের পরিবার যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিদিন সংগ্রাম করে, তাহলে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছেছে—এ কথা বলা কঠিন।
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা মানে শুধু একজন কর্মীর আয় বাড়ানো নয়; বরং একটি পরিবারকে দারিদ্র্যের চাপ থেকে মুক্তির সুযোগ দেওয়া।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...
❮

❯
Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat