×
সদ্য প্রাপ্ত:
জনমনে আতঙ্ক ছড়াতেই বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ: ডিএমপি গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী একাত্তরের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, চব্বিশ ছিল রক্ষার: প্রধানমন্ত্রী খুলনায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে: প্রধানমন্ত্রী চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোরে ভূরাজনৈতিক শঙ্কা নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী খান জাহান আলীর (রহ.) মাজার জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী একটি মহল চক্রান্ত করে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কে প্রবাসীদের গাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি: চালকসহ গ্রেফতার ৩, লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার
  • প্রকাশিত : ২০২৬-০২-০৫
  • ১৬৯ বার পঠিত
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ 

একটি জাতির ইতিহাসে কিছু সময় থাকে, যা কেবল স্মৃতির জন্য নয়—দায়বদ্ধতার জন্যও। বাঙালির জীবনে ফেব্রুয়ারি তেমনই একটি সময়। এই মাস আমাদের শুধু অতীতের ত্যাগ স্মরণ করায় না; বরং বারবার প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি সেই ত্যাগের যথার্থ মর্যাদা দিতে পেরেছি? মাতৃভাষার মাস ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে আবেগের যেমন, তেমনি আত্মসমালোচনারও একটি আয়না।

ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমমাত্র নয়; এটি তার চিন্তা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ধারক। মাতৃভাষার মাধ্যমেই মানুষ পৃথিবীকে প্রথম চিনতে শেখে, নিজের অনুভূতিকে ভাষা দেয় এবং সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করে। তাই ভাষার ওপর আঘাত মানে কেবল শব্দের ওপর আঘাত নয়—তা একটি জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ওপর আঘাত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সেই সত্যকে রক্তের অক্ষরে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন একটি বহুভাষিক রাষ্ট্রে একক ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বাঙালির প্রতিবাদ ছিল স্বাভাবিক, যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেবে, তা হয়তো তখন কেউ কল্পনাও করেনি। ভাষা আন্দোলন কেবল বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক অধিকার, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর।

একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন—অধিকার ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না, তা আদায় করে নিতে হয়। এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর নৈতিক অবস্থান। কোনো অস্ত্র নয়, কোনো সন্ত্রাস নয়—ছিল যুক্তি, ঐক্য ও আত্মত্যাগ। ভাষা আন্দোলনের এই নৈতিক উচ্চতা একে বিশ্বের ইতিহাসে অনন্য করে তুলেছে এবং আজও এটি নিপীড়িত ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
এই আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে ১৯৯৯ সালে, যখন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে একুশের চেতনা কেবল জাতীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক মানবাধিকারের প্রতীকে পরিণত হয়। ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার—এই দুটি বিষয়কে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে একুশে ফেব্রুয়ারি।

তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দায়ও বেড়েছে বহুগুণ। যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, তার কাছ থেকে বিশ্ব প্রত্যাশা করে ভাষার সর্বোচ্চ সম্মান ও ব্যবহারিক মর্যাদা। কিন্তু বাস্তব চিত্র কতটা আশাব্যঞ্জক—
সে প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিই, আলোচনা সভা করি, কবিতা আবৃত্তি করি—এগুলো নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় ও সম্মানজনক আয়োজন। কিন্তু ফেব্রুয়ারি শেষ হলে ভাষার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাও কি অনেকাংশে শেষ হয়ে যায় না? মাতৃভাষার প্রতি অবহেলা এখন আর কোনো বহিরাগত শাসকগোষ্ঠী থেকে আসে না; আসে আমাদের নিজেদের জীবনাচরণ, মানসিকতা ও নীতিগত উদাসীনতা থেকে।

দাপ্তরিক কাজে, শিক্ষাঙ্গনে, আদালতে এবং এমনকি গণমাধ্যমেও আমরা প্রায়ই অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করি। ইংরেজি বা বিদেশি ভাষাজ্ঞানকে আমরা আধুনিকতা ও মেধার একমাত্র মানদণ্ড বানিয়ে ফেলেছি, আর বাংলাকে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতি, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো জাতির জন্য শুভ ফল বয়ে আনে না।

ভাষার মর্যাদা রক্ষা মানে কেবল ভাষায় কথা বলা নয়; শুদ্ধভাবে, সচেতনভাবে এবং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বানানের অবহেলা, বাক্যের বিকৃতি কিংবা ভাষার অযথা বিকলাঙ্গকরণ আমাদের ভাষার সৌন্দর্য ও শক্তিকে ক্ষুণ্ন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার অপব্যবহার অনেক সময় ভাষাচর্চাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। মাতৃভাষার মাস আমাদের এই অবক্ষয়ের দিকেও দৃষ্টি দিতে বাধ্য করে।

শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব নিয়ে দেশে-বিদেশে অসংখ্য গবেষণা হয়েছে। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ শিশুর চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বাড়ায়—এ কথা বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত। তবুও বাস্তবে আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত। বাংলা মাধ্যমে মানসম্মত পাঠ্যবই, দক্ষ শিক্ষক এবং আধুনিক গবেষণার ঘাটতি ভাষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে রাখছে।

ফেব্রুয়ারি আমাদের এই কাঠামোগত দুর্বলতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রযুক্তির যুগে ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার ডিজিটাল সক্ষমতার ওপর। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়লেও মানসম্পন্ন ও গবেষণাভিত্তিক কনটেন্টের অভাব এখনো প্রকট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, বিজ্ঞানচর্চা ও উচ্চশিক্ষায় বাংলার কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের ভাষাগত বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে।

মাতৃভাষার মাস আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলা ভাষা কেবল আন্দোলনের ভাষা নয়; এটি প্রেম, প্রতিবাদ, মানবতা ও নান্দনিকতার ভাষা। এই ভাষায় সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বমানের সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন। কিন্তু এই সৃজনশীল ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে পাঠাভ্যাস, গবেষণা ও মৌলিক সৃষ্টিকে উৎসাহিত করতে হবে।আজকের তরুণ সমাজের কাছে মাতৃভাষার মাস নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি। একুশ যেন কেবল পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় বা আনুষ্ঠানিক দিবস হয়ে না থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চলচ্চিত্র, গবেষণা, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই মাতৃভাষার সৃজনশীল ব্যবহারই পারে ভাষাকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলতে। এখানে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ।

সবশেষে বলতে হয়, ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে শুধু শোকের নয়, শপথের মাস। এই শপথ—আমরা আমাদের ভাষাকে কেবল স্মরণ করব না, ব্যবহার করব; কেবল ভালোবাসব না, মর্যাদা দেব; কেবল গর্ব করব না, দায়িত্ব নেব। মাতৃভাষার প্রতি এই দায়বদ্ধতাই পারে একুশের আত্মত্যাগকে সত্যিকার অর্থে সার্থক করতে।কারণ ভাষা বাঁচে চর্চায়, ব্যবহারে ও মর্যাদায়। আর মাতৃভাষা বাঁচলে বাঁচে একটি জাতির আত্মা, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...
❮

❯
Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat