মোঃ আল-আমিন সরকার, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
জীবন কখন কাকে কোথায় এনে দাঁড় করায়, তা কেউ জানে না। যে মানুষটি একসময় ছিলেন মেধাবী ছাত্র, পড়াতেন শিক্ষার্থীদের, ঢাকায় করতেন ভালো চাকরি—আজ সেই মানুষটির রাত কাটে ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায়। নেই মাথা গোঁজার নিশ্চিন্ত ঠাঁই, নেই জীবিকার অবলম্বন, নেই জীবনের আগের সেই পরিচিত ছন্দ। দিনের পর দিন মানুষের করুণার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন তিনি। চার বছর ধরে সলপ ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দাই তাঁর রাতের একমাত্র আশ্রয়স্থল।
বলছি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলপ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হাড়িভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা, দেওয়ান বংশের সন্তান মো. দেওয়ান আব্দুল খালেকের কথা। বয়স ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে। একসময় দেওয়ান বংশের সন্তান হিসেবে এলাকায় তাঁর বেশ পরিচিতি ছিল। মেধা, শিক্ষা ও কর্মজীবন নিয়ে ছিল আলাদা স্বপ্ন। কিন্তু জীবনের এক মর্মান্তিক ঘটনার পর সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে যায়। হারিয়ে যায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথ।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় ৪০ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দিন কাটছে তাঁর। দীর্ঘ এই সময়ে জীবনের কত ঋতু বদলেছে, কত মানুষ আপনজনের সান্নিধ্যে ঘরে ফিরেছেন, কত রাত কেটেছে নিরাপদ আশ্রয়ে—কিন্তু আব্দুল খালেকের জীবনে সেই স্বাভাবিকতা আর ফিরে আসেনি।
সলপ ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য মো. রাকিবুল ইসলাম আকন্দ দৈনিক সোনালী কন্ঠ - কে জানান, “আব্দুল খালেক আমার পাশের বাড়ির বাসিন্দা। একসময় তিনি খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। এলাকায় প্রাইভেট শিক্ষকতা করতেন। ঢাকায়ও ভালো একটি চাকরি করতেন। তাঁর জীবন ছিল স্বাভাবিক ও কর্মব্যস্ত।
রাকিবুল ইসলাম আকন্দ আরও জানান, একদিন ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন আব্দুল খালেক। তাঁর ব্যাগে থাকা প্রায় ৪০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। সেই ঘটনার পর থেকেই তাঁর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর আর আগের জীবনে ফিরতে পারেননি।
একটি ঘটনার পর বদলে যায় একটি মানুষের পুরো জীবন। যে হাতে একসময় শিক্ষার্থীদের পড়ার বই তুলে দেওয়া হতো, যে মানুষটি নিজের উপার্জনে চলতেন, আজ তাঁকেই নিজের খাবারের নিশ্চয়তার জন্য অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। যে মানুষটির ছিল নিজস্ব কর্মস্থল ও পরিচিত ঠিকানা, আজ তাঁর স্থায়ী আশ্রয় বলতে সলপ ইউনিয়ন পরিষদের একটি বারান্দা।
প্রায় চার বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের বারান্দায় রাত কাটান আব্দুল খালেক। কখনো কৃষকগঞ্জ বাজারে থাকতেন। আশপাশের মানুষ যে যেভাবে পারেন, তাঁকে খাবার দেন। কারও দেওয়া একবেলা খাবার, কারও সামান্য সহযোগিতাই তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। নিজের প্রয়োজনের কথা গুছিয়ে বলার মতো অবস্থাও তাঁর নেই বলে জানান স্থানীয়রা।
দিন শেষে যখন মানুষ আপন ঘরে ফেরে, পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খায়, নিশ্চিন্তে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়, তখন আব্দুল খালেকের রাত কাটানোর জায়গা হয় ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দা। চারপাশে নীরবতা নামে, বন্ধ হয়ে যায় দিনের কর্মব্যস্ততা; কিন্তু তাঁর জীবনে অনিশ্চয়তার যেন কোনো বিরতি নেই। একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসার প্রয়োজন নিয়েই কাটছে তাঁর দিন।
আব্দুল খালেকের জীবনের গল্পটি কেবল একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের অসহায়ত্বের গল্প নয়, এটি সময়ের নির্মম পরিহাসেরও এক করুণ চিত্র। একসময় যাঁর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে জীবন চালানোর সামর্থ্য ছিল, আজ তাঁকেই বেঁচে থাকার জন্য মানুষের সামান্য সহানুভূতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় কোনো রকমে দিন পার হলেও তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসা, নিরাপদ আবাসন, খাবার এবং সার্বক্ষণিক দেখভাল। তাঁর পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মানবিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।
সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনের গল্প লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। আব্দুল খালেকও তেমন একজন। তাঁর অতীতের মেধা, শিক্ষকতা কিংবা চাকরির পরিচয় আজ আর কোনো কাজে আসে না। ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় রাত কাটানো এই মানুষটির প্রয়োজন এখন একটু আশ্রয়, একটু যত্ন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আর মানুষের সামান্য মানবিকতা।
হয়তো তাঁর হারিয়ে যাওয়া আগের জীবনে তিনি আর কখনো ফিরবেন না। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়টুকু যেন অন্তত অনাহারে, অনিশ্চয়তায় আর অবহেলায় কাটাতে না হয়—এটাই এখন স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।