স্পেশাল প্রতিবেদন | প্রথম পর্ব
প্রণয় দাশগুপ্ত শিমুল, চট্টগ্রাম ব্যুরো
দেশজুড়ে এখন এক আতঙ্কের নাম কিশোর গ্যাং। এক সময় পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব বা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মারামারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এই গ্যাংগুলো রূপ নিয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, অস্ত্রবাজি, ইভটিজিং, ভাড়াটে হামলা এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এরা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, মাদারীপুর, গাজীপুর পর্যন্ত সারা দেশেই এর বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
ঢাকায় ১১৮টি সক্রিয় গ্যাং
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা মহানগরীর ৫০টি থানা এলাকায় বর্তমানে অন্তত ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এরা আর নিছক ‘বখে যাওয়া কিশোরদের দল’ নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এদের বড় একটি অংশ স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ এবং প্রভাবশালীদের মাঠ পর্যায়ের বাহিনী বা ‘ফিল্ড ফোর্স’ হিসেবে কাজ করছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অর্থের ভাগাভাগিই এদের মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইয়ের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এদের হাতে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ নিয়ে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী স্থানীয়দের সাথে মতবিনিময় সভা করে ‘কিশোর গ্যাং বলে কিছু থাকবে না’ বলে কঠোর অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পল্লবী, আদাবর, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ীতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি শেরেবাংলা নগরে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে দুই পুলিশ সদস্য ছুরিকাঘাতে আহত হন। আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় একটি বিকাশ এজেন্টের দোকানে ঢুকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নগদ তিন লাখ টাকা ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় সক্রিয় ‘ভইরা দে গ্রুপ’-এর বিরুদ্ধে মারধর, আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, চাঁদাবাজি ও মাদক সেবনের অভিযোগ রয়েছে। পল্লবীতে সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় ভইরা দে গ্রুপের সদস্য আতিককে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঢাকার বাইরেও ভয়াবহ চিত্র
ঢাকার বাইরের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে তিন কিশোর গ্যাং সদস্যকে ধারালো ছুরিসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা রাতে পথচারীদের অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করত।
মাদারীপুরে কিশোর গ্যাং কালচার দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গত এক বছরে শুধু পৌর এলাকায় অন্তত ৩০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই হাতবোমা ফাটিয়ে, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বসতবাড়ি ও দোকানপাটে হামলা চালাচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোররা।
চাঁদপুরের মতলব উত্তরে এক রাতে ২০ জন কিশোর গ্যাং সদস্যসহ ২৭ জনকে আটক করা হয়। গাজীপুরের টঙ্গী ও আব্দুল্লাহপুর থেকে র্যাব ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে, যাদের কাছ থেকে চাইনিজ কুড়াল, চাকু ও বাইকের চেইন উদ্ধার করা হয়। নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের মিছিল থেকে ১৮ জনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা।
কেন এই বিপথগামিতা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে ৪টি প্রধান কারণ। প্রথমত, পারিবারিক নজরদারির অভাব ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি। দ্বিতীয়ত, মাদকের সহজলভ্যতা। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরাধের হিরোইজম — টিকটক ও ফেসবুকে আধিপত্য দেখানোর ভিডিও বানাতে গিয়ে তারা অপরাধে জড়াচ্ছে। চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো স্থানীয় রাজনৈতিক ও মাদক গডফাদারদের ছত্রছায়া।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও শুধু আটক করে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়ায় কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন, পারিবারিক সচেতনতা, স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং, কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পেছনের গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। তা না হলে এই কিশোর গ্যাং আগামীতে আরও বড় অপরাধচক্রে পরিণত হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..