মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি:
দেশের স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধের বাজারে তৈরি হয়েছে এক অনিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্য। ওষুধের কৃত্রিম সংকট তৈরি,মনগড়া মূল্যবৃদ্ধি, অহেতুক পরীক্ষা,নিরীক্ষার কমিশন বাণিজ্য এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী বিপণন কৌশলে সাধারণ রোগীরা এখন চরম জিম্মি, সেবা পাওয়ার বদলে হাসপাতাল ও চেম্বারগুলোতে প্রতিনিয়ত শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক থেকে মধ্যবিত্ত মানুষ।
ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রলোভন ও চিকিৎসকদের নৈতিকতার সংকট
অভিযোগ উঠেছে, বড় থেকে ছোট বেশিরভাগ ওষুধ কোম্পানি তাদের পণ্য বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চিকিৎসকদের পেছনে বিপুল অর্থ ও উপহার বিনিয়োগ করছে। চিকিৎসকদের জন্য বিলাসবহুল উপহার, নগদ অর্থ, পরিবারসহ বিদেশ ভ্রমণ ও চেম্বার সাজানোর মতো নানা সুবিধা দেওয়ার বিনিময় হিসেবে নির্ধারিত হচ্ছে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ। ফলস্বরূপ, রোগীর শারীরিক প্রয়োজনের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানির স্বার্থ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। স্বল্প পরিচিত কিংবা নিম্নমানের ওষুধ প্রেসক্রাইব করার হার বাড়ায় রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
হাসপাতাল এবং ব্যক্তিগত চেম্বারের সামনে প্রতিদিন দেখা মেলে ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল প্রতিনিধিদের দীর্ঘ লাইন। ডাক্তার চেম্বার থেকে বের হওয়া মাত্রই রোগীকে ছেঁকে ধরেন একাধিক প্রতিনিধি। রোগীর সম্মতি ছাড়াই হাত থেকে জোরপূর্বক প্রেসক্রিপশন কেড়ে নিয়ে মোবাইল ফোনে ছবি তোলার দৃশ্য নিত্যদিনের। কোম্পানিকে 'প্রমাণ' দেওয়ার এই অনৈতিক চর্চায় রোগীদের ব্যক্তিগত ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যের চরম লঙ্ঘন ঘটছে। অনেক সময় বয়স্ক ও জটিল রোগীরা এতে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
রোগ নির্ণয়ের নামে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে চিকিৎসকদের গড়ে উঠেছে অনৈতিক কমিশন চক্র। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও রোগীদের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার জটিল ও ব্যয়বহুল পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হচ্ছে, যার বড় একটি অংশ কমিশন হিসেবে চলে যায় সংশ্লিষ্টদের পকেটে। এর ওপর চিকিৎসকদের চেম্বার ফি নির্ধারণে সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট বা কার্যকর নীতিমালা না থাকায় ইচ্ছামতো ফি হাঁকানো হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংকট ও অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত অত্যাবশ্যকীয় ১১৭টি ওষুধের উৎপাদনে অনীহা দেখাচ্ছে অনেক কোম্পানি। অজুহাত তিন দশক আগের সরকারি মূল্য কাঠামোয় লাভ কম হওয়া। ফলে বাজারে জীবনরক্ষাকারী মৌলিক ওষুধগুলোর কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। সাধারণ প্যারাসিটামল বা অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে সামান্য উপাদানের নাম পরিবর্তন করে নতুন ব্র্যান্ড বা স্ট্রিপে দ্বিগুণ-ত্রিগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে, কমিশন বাণিজ্যের প্রভাবে সাধারণ ঠাণ্ডা-জ্বরেও প্রেসক্রাইব করা হচ্ছে উচ্চমাত্রার ও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক, যা মানবদেহে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য খাতের এই নৈরাজ্য থেকে জনগণকে মুক্ত করতে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন
জেনেরিক নামের ব্যবহার: প্রেসক্রিপশনে সুনির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির ব্র্যান্ড নাম না লিখে ওষুধের মূল জেনেরিক নাম (Generic Name) লেখা বাধ্যতামূলক,
হাসপাতাল ও চেম্বারে ঔষধ কোম্পানিদের প্রতিনিধিদের যাতায়াত নির্দিষ্ট সময়সীমায় আনা এবং রোগীদের প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলা আইনিভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করা।
ফি ও টেস্টের মূল্য নির্ধারণ: চিকিৎসকদের ফি এবং ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক টেস্টের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে সরকারি তদারকি সেল গঠন করা।
কঠোর নজরদারি: ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী কোম্পানি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
চিকিৎসা খাতকে বাণিজ্য ও দালালি মুক্ত করে রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর হস্তক্ষেপ চায় সাধারণ জনগণ!
এ জাতীয় আরো খবর..