প্রণয় দাশ গুপ্ত শিমুল । চট্টগ্রাম ব্যুরো
স্পেশাল প্রতিবেদনের -দ্বিতীয় পর্ব
*চট্টগ্রাম মহানগরে ছিনতাই-ইভটিAজিংয়ের হটস্পট, আতঙ্কে নগরবাসী: নেপথ্যে মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাং*
চট্টগ্রাম মহানগরীতে দিন দিন বাড়ছে ছিনতাই, মোবাইল চুরি ও ইভটিজিংয়ের ঘটনা। সন্ধ্যা নামতেই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ব্যস্ততম স্পটগুলোতে সাধারণ মানুষের চলাচল হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইপিজেড, আগ্রাবাদ, নিউ মার্কেট, ওয়াসা, জিইসি, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা ও নতুন ব্রিজ মোড়।
সরেজমিনে অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই স্পটগুলোতে সংঘবদ্ধ চক্র কৌশলে পথচারীদের টার্গেট করছে। বিশেষ করে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর ও নতুন ব্রিজ এলাকায় চলন্ত বাস থেকে নামার সময় যাত্রীদের মোবাইল ও ব্যাগ টান দিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রিকশায় থাকা নারী যাত্রীদের ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের।
নিউ মার্কেট ও আগ্রাবাদ এলাকায় অফিস ফেরত মানুষজন সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। জিইসি ও ২ নম্বর গেট এলাকায় প্রাইভেটকার বা রিকশায় বসে মোবাইল ব্যবহার করার সময় জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মোবাইল ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
*উদাহরণ-১: মুরাদপুরে ছুরিকাঘাত*
গত সপ্তাহে মুরাদপুরে রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রাম কলেজের এক ছাত্রের মোবাইল ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। তিনি বাধা দিলে কিশোর গ্যাংয়ের ৩ সদস্য তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন।
*উদাহরণ-২: ২ নম্বর গেটে ছাত্রীকে ইভটিজিং*
ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় একটি বেসরকারি কলেজের দুই ছাত্রী কোচিং থেকে ফেরার সময় ৫-৬ জন কিশোর তাদের পিছু নেয় এবং অশালীন মন্তব্য করতে থাকে। তারা প্রতিবাদ করলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে বখাটেরা পালিয়ে যায়।
*নেপথ্যে কারা?*
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসব অপরাধের ৮০ ভাগের সাথে জড়িত মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাং। এদের বয়স ১৫ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। এরা গ্রুপ আকারে ৭-৮ জন মিলে একটি স্পট নিয়ন্ত্রণ করে। এদের হাতে থাকে চাপাতি, ছুরি, ক্ষুর, এন্টি-কাটার, বাইকের চেইন ও লোহার রড।
মাদকের টাকা জোগাড় করতেই এরা ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। দিনের বেলায় তারা এলাকায় আড্ডা দেয়, টিকটক করে এবং সন্ধ্যার পর সক্রিয় হয়ে ওঠে। কেউ প্রতিবাদ করলে তারা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে দ্বিধা করে না। ফলে জান-মালের ভয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না, দেখেও চুপ থাকে।
*কেন বাড়ছে এই অপরাধ?*
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে রয়েছে স্থানীয় কিছু চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া। পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেও আইনের ফাঁক দিয়ে তারা দ্রুত বেরিয়ে আসে। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
নগরবাসী এখন চরম উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। নগরবাসীর দাবি, চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে পুলিশের স্থায়ী টহল, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি, পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় চট্টগ্রাম মহানগরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।
এ জাতীয় আরো খবর..