×
সদ্য প্রাপ্ত:
খুলনায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে: প্রধানমন্ত্রী চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোরে ভূরাজনৈতিক শঙ্কা নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী খান জাহান আলীর (রহ.) মাজার জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী একটি মহল চক্রান্ত করে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কে প্রবাসীদের গাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি: চালকসহ গ্রেফতার ৩, লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার তাহসিফ হত্যা মামলায় আবারও ৩ দিনের রিমান্ডে দীপ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতা করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • প্রকাশিত : ২০২৬-০৯-২০
  • ৫৩ বার পঠিত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার এবং সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নটি বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিমালা এবং সাংবিধানিক রূপরেখা পরিবর্তনের জন্য যে গণআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় এবং জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ময়দানে এক নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ও ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটি বা অন্য কোনো বিকল্প উপায়ে সংবিধান সংশোধনের যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক জোট ‘১১ দলীয় ঐক্য’। জোটটির শীর্ষ নেতারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, জনগণের পবিত্র ভোট এবং গণরায়কে খর্ব করে বা এড়িয়ে গিয়ে কোনো ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তন জনগণ মেনে নেবে না।

১. সংবিধান সংস্কার কমিটির সভা বর্জন ও ১১ দলীয় ঐক্যের সংবাদ সম্মেলন

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন বা সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্যে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির কার্যপ্রণালী ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে শুরু থেকেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই কমিটির কার্যক্রমের প্রতিবাদ জানিয়ে এবং এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্ত নেয় ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের শরিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট প্রদান করেছে, সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে তারেক বা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার যে কোনো অপচেষ্টা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।

এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংশোধন কমিটির সভা আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করার পর জরুরি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করে ১১ দলীয় ঐক্য। সংবাদ সম্মেলনে জোটের শীর্ষ নেতারা অভিযোগ করেন যে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য বা জনগণের রায়কে পাশ কাটিয়ে গোপনীয়তার সঙ্গে সংবিধানের মৌলিক ধারাগুলো পরিবর্তনের চক্রান্ত চলছে। তারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, গণভোটের রায় হলো সর্বোচ্চ সার্বভৌম অভিব্যক্তি; সুতরাং এর ব্যত্যয় ঘটানোর বা একে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই।

২. জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ম্যান্ডেটের মূল তাৎপর্য

গত গণভোটে এ দেশের আপামর জনসাধারণ স্বৈরাচারী ব্যবস্থার চিরতরে অবসান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার পক্ষে তাদের রায় প্রদান করেছিল। জুলাই গণঅভ্যুথানের পর ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্যই ছিল সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের পথ চিরতরে বন্ধ করা।

১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা সংবাদ সম্মেলনে জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত এবং গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর একক ইচ্ছায় কাটাছেঁড়া করার সুযোগ নেই। জনগণের দেওয়া পবিত্র আমানত ও গণরায়কে সম্মান জানিয়ে প্রতিটি সংস্কার প্রস্তাব হুবহু এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার এবং গণরায়কে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার বানানোর যেকোনো প্রবণতা জাতীয় ঐক্যের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে তারা মন্তব্য করেন।

৩. শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি

সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষস্থানীয় নেতারা সরকারের বর্তমান নীতিনির্ধারক ও সংসদীয় কমিটির কার্যপদ্ধতির কড়া সমালোচনা করেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এহিউম হামিদুর রহমান আযাদসহ জোটের অন্যান্য শরিক দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধানসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, "জনগণের ভোট কোনো দলের রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী গ্রহণ বা উপেক্ষা করার বিষয় নয়। গণরায়ের প্রতি সম্মান দেখানোই গণতন্ত্রের মূল দাবি। যদি সরকার বা কোনো বিশেষ মহল মনে করে যে, তারা গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলো সংশোধন করে নেবে, তবে জনগণ তা মেনে নেবে না।" তারা আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাজপথের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে অর্জিত এই ঐতিহাসিক সুযোগকে কোনো সুবিধাবাদী চক্রের হাতে নস্যাৎ হতে দেওয়া হবে না।

৪. সংসদীয় বিশেষ কমিটির ভূমিকা ও সাংবিধানিক বিতর্ক

সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটি এবং ১১ দলীয় ঐক্যের এই দ্বন্দ্ব মূলত দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর সংকটকে ফুটিয়ে তুলেছে। আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের দীর্ঘমেয়াদি আকাঙ্ক্ষা এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হচ্ছিল যে, সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, যদি সেই প্রক্রিয়াটি জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট বা গণভোটের চেতনার পরিপন্থী হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। ১১ দলীয় ঐক্যের মূল আপত্তি এখানেই—তারা মনে করে, সংসদীয় কমিটি যদি গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে নিজেদের মতো করে ধারা সংযোজন বা বিয়োজন করে, তবে তা সরাসরি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।

৫. দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একদিকে যখন অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিভিন্ন মহলের নানামুখী দাবি-দাওয়া নিয়ে দেশ উত্তপ্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে সংবিধান সংস্কারের এই বিরোধ নতুন মাত্রার রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে। বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সংবিধানকে দলীয় স্বার্থে কাটাছেঁড়া করা হয়েছিল এবং চতুব্বিংশ সংশোধনীসহ বিভিন্ন বিতর্কিত আইনের মাধ্যমে বিচার বিভাগ ও শাসনবিভাগকে কুক্ষিগত করা হয়েছিল।

জনগণ সেই অন্ধকার যুগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল এবং আমূল পরিবর্তনের পক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছিল। এখন যদি সেই সংস্কারের মূল স্পিরিট বা আত্মাকে পদদলিত করে কোনো সমঝোতার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়, তবে তা নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। ১১ দলীয় ঐক্যের এই কঠোর অবস্থান সরকারের নীতিনির্ধারকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে এবং আগামী দিনে জাতীয় সংসদ ও রাজপথের রাজনীতিতে বড় ধরনের সংঘাতের শঙ্কা তৈরি করেছে।

৬. সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা উত্তরণকালীন সময়ে জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া সংবিধানের মতো মৌলিক দলিল সংশোধন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ১১ দলীয় ঐক্যের এই প্রতিরোধ কেবল একটি রাজনৈতিক জোটের প্রতিবাদ নয়, এটি জনগণের একটি বড় অংশের আবেগ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন। যদি সরকার সকল রাজনৈতিক দল ও জোটকে আস্থায় নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার মাধ্যমে গণরায়ের প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তবে সাংবিধানিক সংকট আরও প্রলম্বিত হবে। তারা অবিলম্বে সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসে এবং জনগণের মূল ম্যান্ডেটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক রূপরেখা চূড়ান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...
❮

❯
Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat