নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে কৌশলগত নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিধান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। এর অধীনে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, জাতীয় প্রবৃত্তি, নিরাপত্তা এবং জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমান অধিকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হবে।’
সোমবার (২ নভেম্বর) বঙ্গভবনে ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬’ এবং ‘আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬’-এ অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দানকালে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এই নির্দেশনা দেন।
রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী, সব শ্রেণি-পেশার সমন্বয়ে গঠিত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যোগ্য নেতৃত্ব প্রদান, শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো গঠন এবং জাতীয় মূল লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক প্রয়াস প্রয়োজন।
এ সময় তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণোৎসর্গকারী বীর শহীদদের প্রতি নি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তাঁদের অতুলনীয় বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অসামান্য অবদান এবং ঐতিহাসিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান মির্জা ফখরুল। একই সঙ্গে ১৯৭৭ সালে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ স্থাপনের মাধ্যমে দেশীয় সামরিক শিক্ষার আধুনিকায়নে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী ভূমিকার কথা স্মরণ করেন তিনি।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ বিগত ১৭ বছর ধরে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী সবার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। জনগণের সম্মান রক্ষা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, চিরাচরিত নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের বাইরেও পরিবেশের পরিবর্তন, সাইবার আক্রমণ, সীমানা ছাড়ানো অপরাধ, উগ্রবাদ, অণুজীবজনিত বিশ্ব মহামারি, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক দুলুনি এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন মানবজাতির সামনে নিত্যনতুন ধারার ঝুঁকি তৈরি করছে।
রাষ্ট্রপতির দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কেবল সামরিক প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, খাদ্য ও শক্তি নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্যতা, প্রযোগপ্রযুক্তিতে সাবলীলতা ও সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও এর আবশ্যিক অংশ।
বর্তমান পৃথিবীর পরিবর্তিত কৌশলগত রাজনীতি তুলে ধরে তিনি জানান, বঙ্গোপসাগর তথা সমগ্র ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে আমাদের অনেক বেশি সতর্ক ও দূরদর্শী হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, অটোমেটেড প্রযুক্তি এবং উন্নত ডিজিটাল কৌশলের বিকাশ সমরক্ষেত্র ও নিরাপত্তার সনাতন ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে গুজব, অসত্য তথ্য ও সাইবার হুমকি জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিবর্তিত আধুনিক প্রেক্ষাপট মোকাবিলায় কৌশলগত দৃষ্টি, প্রজ্ঞাপূর্ণ বিচার-বিশ্লেষণ, মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলার দক্ষতাসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরি করার প্রতি জোর দেন রাষ্ট্রপতি।
ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, সামরিক বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের মধ্যে চিন্তাভাবনার আদান-প্রদান এবং আধুনিক নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো নিয়ে একটি সম্যক ধারণা গঠনে এই প্রতিষ্ঠানটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬’ ও ‘আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬’-এর সকল প্রশিক্ষণার্থীকে শুভকামনা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি আহ্বান জানান, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সর্বদা দেশ ও দেশের মানুশের স্বার্থকে সবার ওপরে রাখতে হবে। এর পাশাপাশি পেশাগত মেধা, পরম সততা, কঠোর শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজ কর্ম পরিচালনা করতে হবে।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া বিদেশি মেহমানদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশে কাটানো সময় ও অর্জিত জ্ঞান নিজ নিজ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মৈত্রীর বন্ধন ও সহযোগিতার সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় উন্নীত করবে।
রাষ্ট্রপতি বিশ্বের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থান, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মাঝে ভাতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচক সংযোগের প্রতি বাংলাদেশের সুদৃঢ় অঙ্গীকার পুনঃব্যক্ত করেন। তিনি সংঘাত এড়িয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা, দ্বিমত ভুলে সংলাপ এবং মুখোমুখি অবস্থান পরিহার করে শান্তির পথে হাঁটার আহ্বান জানান।
পরিশেষে দক্ষতা ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরলস সেবা দেওয়ার জন্য ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও প্রশংসা জানান তিনি।
উক্ত আয়োজনে প্রারম্ভিক বক্তব্য দেন ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. ফয়জুর রহমান।
এ সময় বঙ্গভবনে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের অনুষদ সদস্য, এনডিসি ও এএফডব্লিউসি কোর্স সম্পন্নকারী সেনাকর্মকর্তাবৃন্দ, অংশগ্রহণকারী বিদেশি অতিথিবৃন্দ, আর্মি স্টাফ অফিসারগণ, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারগণ (জেসিও) এবং বঙ্গভবনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬’-এ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ৫৪ জন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) থেকে ১৮ জন এবং বিশ্বের ১৭টি বন্ধুপ্রতিম দেশ থেকে আসা ৩১ জনসহ মোট ১০৩ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করেন।