×
সদ্য প্রাপ্ত:
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন: গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠকে বসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত সব পোশাক কারখানা ছুটি ঘোষণা তাহসিফ সউরি হত্যা মামলায় ৪ দিনের রিমান্ডে দীপ পুলিশের ছয় কর্মকর্তাকে বদলি তুরাগে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন মোড়, ঘটনাস্থলের কাছেই মিলল মোটরসাইকেল মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলাঃ মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী আজ ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৯৮২ জন আইইডিসিআরের কার্যালয়ে ঢুকে পরিচালককে মারধর, অভিযোগ ড্যাবের বিরুদ্ধে
  • প্রকাশিত : ২০২৬-১১-০১
  • ৪৩ বার পঠিত
১২ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয়ে অন্ধকার জগত; ক্যাম্পজুড়ে সশস্ত্র অপরাধ চক্রের

মোঃ অলিউদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি:

​বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভূ-স্বর্গখ্যাত কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ভাসানচর এখন কেবল একটি মানবিক আশ্রয়ের ঠিকানা নয়; বরং এটি দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক গভীর ও বহুমুখী জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। প্রায় সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকের (রোহিঙ্গা) স্থায়ী পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে থাকায় এই অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি এখন এক বিস্ফোরক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের উদাসীনতা, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং স্থানীয় আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের ফলে এই জনপদ এক বিপজ্জনক ও জটিল বাস্তবের মুখোমুখি।

​কক্সবাজারের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং ভাসানচরের আশ্রয়ন প্রকল্পে গত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে, তা স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার বলয় টিকিয়ে রাখতে সক্রিয় রয়েছে একাধিক সশস্ত্র অপরাধী চক্র ও সন্ত্রাসী দল। আধিপত্য বিস্তারের জেরে প্রায় নিয়মিতই ক্যাম্পগুলোতে গোলাগুলি, অপহরণ ও খুনের ঘটনা ঘটছে। সাধারণ রোহিঙ্গা সাধারণ মানুষ ছাড়াও ক্যাম্পের শান্তি ও শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা প্রভাবশালী কমিউনিটি নেতা বা 'মাঝি'রা প্রায়ই এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাফ নদী ও দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে ইয়াবা ও আইস (ক্রিস্টাল মেথ)-এর মতো ভয়ংকর মাদকের চালান দেশে প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট হয়ে উঠেছে এই সীমান্ত অঞ্চল। এর পাশাপাশি, ক্যাম্পের ভেতরে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপ্রবেশ এবং অপরাধীদের গোপন আস্তানার সন্ধান মিলছে নিয়মিত অভিযানে। উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের চরম অভাবকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র ও স্থানীয় দালালেরা রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা অন্যান্য দেশে পাড়ি জমাতে প্রলুব্ধ করছে। ট্রলারডুবিতে সাগরে প্রাণহানির ঘটনা যেন এই অবধারিত নিয়তিরই এক নিষ্ঠুর চিত্র।

​রোহিঙ্গা সংকটের নেতিবাচক প্রভাব এখন আর ক্যাম্পের চার সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জনজীবনেও। উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর পাহাড়ি বনভূমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় করে অপরিকল্পিতভাবে এই ক্যাম্পগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি পাহাড় ধস ও তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়েছে পুরো অঞ্চল।স্থানীয় শ্রমবাজারে সস্তা শ্রমের সহজলভ্যতার কারণে উখিয়া ও টেকনাফের নিম্নবিত্ত ও দিনমজুর স্থানীয় বাঙালিরা মারাত্মকভাবে কাজ হারাচ্ছেন। এর ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পের বাইরেও চুরি, ছিনতাই, অপহরণ ও নানা অপরাধমূলক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক অসন্তোষ দানা বাঁধছে।
​বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত—যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি—রোহিঙ্গা সংকটের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর ও মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা (যেমন ইউএনএইচসিআর ও ডব্লিউএফপি) এবং দাতা দেশগুলোর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার তহবিল ও খাদ্য বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। মাসিক রেশনে কাটছাঁট করায় ক্যাম্পগুলোতে চরম অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, যা অনেককে পেটের দায়ে বা হতাশা থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছে।

​মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (AA)-এর মধ্যকার চলমান তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সমস্ত দরজাকে প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই পুনর্বাসনের পরিবেশ তো তৈরিই হয়নি, বরং সীমান্তজুড়ে গোলাগুলি ও সহিংসতার কারণে নতুন করে নতুন কোনো অনুপ্রবেশের আতঙ্কও বজায় রয়েছে।

​সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নানামুখী গুজব, অতিরঞ্জিত তথ্য এবং ভীতিকর প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।ক্যাম্পগুলোতে জন্মহার কিছুটা বেশি হওয়াটা জনমিতিক বাস্তবতার অংশ হলেও, এটিকে কোনো নির্দিষ্ট বা সুদূরপ্রসারী "ষড়যন্ত্র" হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিবার পরিকল্পনা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে কোনো কোনো মহলে দাবি করা হয় যে, চীনকে প্রতিহত করতে জাপান বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো গোপন ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। মূলত জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ পরীক্ষিত উন্নয়ন সহযোগী এবং তারা সবসময় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পক্ষে জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সাথে চীনের ঐতিহ্যগত ও গভীর কৌশলগত সম্পর্ক থাকায় বাংলাদেশ সরকার সবসময় ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে (বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন) সংকট সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আসছে। সুতরাং, এই দুই দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো সামরিক বা গোপন চক্রান্ত নয়, বরং তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক কূটনীতির অংশ।

​বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই জটিল সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে বহুমুখী ও কঠোর কৌশল গ্রহণ করতে হবে:

​এপিবিএন, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ক্যাম্পের ভেতরের অপরাধ চক্র, অস্ত্র ও মাদকের আস্তানাগুলো সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হবে। ক্যাম্পের সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি (সিসিটিভি, ড্রোন নজরদারি ও বায়োমেট্রিক ট্র্যাকিং) আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...
❮

❯
Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat