অর্থনীতি প্রতিবেদকঃ
সর্বনিম্ন বেতন বৃদ্ধি এবং আন্দোলনরতদের কালো তালিকাভুক্তি বাতিলের দাবিসহ একাধিক বিষয়ে চলা অসন্তোষের মুখে দেশের প্রধান তিনটি শিল্প এলাকায় চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় এবং তৈরি পোশাকশ্রমিকরা উৎপাদন বন্ধ করে বেরিয়ে পড়ায় রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ এবং সাভার-আশুলিয়া-জিরানী অঞ্চলের অন্তত ৬৭০টি পোশাক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে কোনো কাজ না করেই কারখানা প্রাঙ্গণ ছেড়ে বাসায় ফিরতে বাধ্য হয়েছেন ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিক।
আজ সোমবার (২ নভেম্বর) তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে এ সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সংগঠনটির বেলা সাড়ে ১১টার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রধান পাঁচটি শিল্পাঞ্চলের মোট ২ হাজার ১৩৪টি তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৪৬৪টি চালু ছিল।
বিজিএমইএ সূত্র আরও উল্লেখ করে, শিল্প এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে। সেখানকার মোট ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টির শ্রমিকরা কাজ পুরোপুরি বন্ধ রেখে বাইরে বের হয়ে যান। ফলে শুধু এই দুই এলাকাতেই কাজ না পেয়ে অলস ফিরে যেতে হয়েছে ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭২ জন তৈরি পোশাককর্মীকে।
প্রায় অভিন্ন রূপ দেখা গেছে সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী অঞ্চলে। সেখানে বিদ্যমান ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২২৩টিতে কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং কর্মস্থল ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫০ জন শ্রমিক।
একইভাবে রাজধানীর মিরপুর এলাকার ৩২০টি কারখানার মধ্যে ৬৫টির উৎপাদন কাজ বন্ধ হয়ে যায়, যার জেরে কাজ না পেয়ে বাসায় ফিরে গেছেন ৫৩ হাজার ৪৫০ জন পোশাকশ্রমিক।
তবে এই আন্দোলনের কোনো ঢেউ লাগেনি নারায়ণগঞ্জের ১৯৭টি এবং চট্টগ্রামের ৩১৪টি তৈরি পোশাক কারখানায়। ওইসব অঞ্চলের সমস্ত কারখানা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মে খোলা রয়েছে বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, গতকাল রোববারও ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা বাস্তবায়ন, ছাঁটাইকৃত কর্মীদের স্বপদে বহাল এবং আন্দোলনে যুক্ত শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি পুরোপুরি বন্ধের দাবিতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবল সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপসহ দু'পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সাভার ও গাজীপুর অঞ্চলে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে তৈরি হওয়া প্রচণ্ড উত্তেজনা ও ভাঙচুরের মুখে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে গতকাল সাভার-আশুলিয়ার ১৭৭টিসহ সারা দেশে সর্বমোট ৫২৯টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছিল কর্তৃপক্ষ।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সহিংসতা চালানো ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে রাজধানীর মিরপুর ও গাজীপুর অঞ্চল থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ এ পর্যন্ত ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শিল্প খাতের এমন অস্থিতিশীল অবস্থা সামাল দেওয়া ও কারখানাগুলোর সুদৃঢ় নিরাপত্তা বিধান করতে গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত সময়ের মধ্যে সকল কারখানা সচল করা এবং শিল্পাঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন।