রাজধানী প্রতিবেদকঃ
সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের আজ সোমবার রাজধানীর মিরপুরের মূল রাজপথে নামার কোনো সুযোগই দেয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিন পৃথক দুই দফায় চড়াও হওয়া শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে ও টিয়ারশেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
প্রথমে মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকায় একদল শ্রমিক জমায়েত হতে গেলে ধাওয়া দিয়ে তাঁদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মিরপুর ২ নম্বর এলাকায় পুনরায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হওয়ার প্রয়াস চালালে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের (টিয়ারশেল) সেল নিক্ষেপ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এদিকে সহিংসতা, বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের নানা ঘটনার জেরে শনি ও রোববার ডিএমপির মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন থানায় মোট পাঁচটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় সোমবার দুপুর নাগাদ মোট ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শ্রমিকদের সড়কে নামার প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়া এবং গণগ্রেপ্তারের বিস্তারিত তথ্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) আবু নাসের রিকাবদার।
দুপুর পৌনে ১টার দিকে ব্যস্ততম মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর মোড়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "আজকে শ্রমিকেরা দুই দফায় মূল সড়কে নেমে আসার চেষ্টা করেছিল। তবে তাদের শান্তিপূর্ণ পন্থায় তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।"
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সকাল ১১টার দিকে মিরপুর ৬ নম্বরের শিয়ালবাড়ী ও পূরবী এলাকার কয়েকটি তৈরি পোশাক কারখানার কর্মীরা একত্র হয়ে মিরপুর ২ হয়ে ১০ নম্বর মোড়ে আসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা জানান, শ্রমিকেরা প্রধানত শিয়ালবাড়ী মোড়ে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিলেন, তবে তাৎক্ষণিক পুলিশি তৎপরতায় তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
সরেজমিনে গিয়ে পরিলক্ষিত হয়, মিরপুর ২ থেকে শিয়ালবাড়ীগামী সড়কের স্টেডিয়াম গেটের সামনে পুলিশের একটি আধপোড়া লেগগার্ড ও রাস্তায় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ইটের টুকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
এর আগে সকাল ৯টার দিকে মিরপুর ১৪ নম্বর অঞ্চলে জড়ো হয়ে ১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এগোতে থাকেন শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশি তাড়া খেয়ে আন্দোলনকারীরা চারদিকে সটকে পড়েন।
গত রোববারের তাণ্ডবে পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, একটি গাড়ি ও একটি ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ভাঙচুরসহ একাধিক বিশৃঙ্খল ঘটনায় মিরপুর বিভাগের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে এ পর্যন্ত পাঁচটি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে।
অভিযুক্তদের আটকের বিষয়ে উপপুলিশ কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার স্পষ্ট জানান, "মামলার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত যেখানে ১৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছিল, আজ দুপুর পর্যন্ত তা বেড়ে মোট ২৯ জনে দাঁড়িয়েছে।"
এর আগে সকালে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড প্রিভেনশন-উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম।
তিনি মন্তব্য করেন, "এই আন্দোলনরত শ্রমিকদের আড়ালে কোনো দুষ্কৃতকারী চক্র, যারা পথঘাট অবরুদ্ধ করে কিংবা আইন অমান্য করে দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের পাঁয়তারা করছে, তাদের পে পেছনে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকতে পারে।"
তিনি আরও দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে বলেন, "আইন অমান্যকারী যে-ই হোক না কেন, যারা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করছে, আমাদের দৃষ্টিতে তারা অপরাধী। আমরা সবাইকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে তৎপর রয়েছি।"
গ্রেপ্তারকৃতদের রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমাদের কাছে কোনো অপরাধীর আলাদা বিশেষ স্বকীয় পরিচয় নেই। যারা সরকারি আইন ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে মানুষের জীবন-জীবিকা ও রাষ্ট্রের সম্পদের ক্ষতি করছে, তারা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। তাদের সবাইকে আমরা গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনছি।"
দুপুরের দিকে মিরপুর ১, মিরপুর ২ এবং ১১ নম্বরের কারখানা এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে শ্রমিকদের কোনো সংগঠিত উপস্থিতি দেখা না গেলেও, পূরবী সংলগ্ন গলি ও অপ্রশস্ত অলিগলিতে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তাঁদের অবস্থান করতে দেখা গেছে।