দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মাঝেই জনস্বাস্থ্যের ওপর এক নীরব কিন্তু ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে এসেছে। শিশু ও সাধারণ মানুষের মাঝে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া হাম (Measles) বা এর উপসর্গজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আরও চারজন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে সারা দেশে নতুন করে ১২৩৬ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে বা চিকিৎসাকেন্দ্রে শরণাপন্ন হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য ও বিভিন্ন হাসপাতালের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করছে যে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সাধারণ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটের রূপ নিতে চলেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হামের উপসর্গ নিয়ে গত একদিনে প্রাণ হারানো চারজনের মধ্যে অধিকাংশই শিশু, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, একদিনে ১২৩৬ জন নতুন আক্রান্তের এই সংখ্যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ দৈনিক সংক্রমণের রেকর্ডগুলোর একটি।
দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে হামের লক্ষণ নিয়ে আসা রোগীদের তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে টিকা দান কর্মসূচির ফাঁকফোকর এবং সচেতনতার অভাবে শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সময়মতো সুচিকিৎসা না পেলে হামের কারণে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ বা তীব্র ডিহাইড্রেশনের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা থাকলেও হঠাৎ করে এর এমন ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটার সম্পর্ক রয়েছে। বিগত সময়ে বিভিন্ন সামাজিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম যে মাত্রায় পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল, তা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
এর ফলে একটি বড় অংশের শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে অথবা তাদের বুস্টার ডোজ সম্পন্ন হয়নি। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, আইসিইউ এবং বিশেষায়িত বেডের সংকট দেখা দেওয়ায় চিকিৎসকরাও রোগীদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিয়েছেন, শিশুদের শরীরে হামের র্যাশ বা জ্বর দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবহেলা না করে নিকটস্থ হাসপাতালে বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। পাশাপাশি, আক্রান্ত শিশুদের অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার মাধ্যমে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।