নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তত ২০টি ধাপ পেরিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বারবার গায়েব হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার পণ্যভর্তি কনটেইনার। তবে পণ্যের সার্বিক সুরক্ষার দায়িত্বে থাকলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করেই দায় সারছে; দিচ্ছে না কোনো ক্ষতিপূরণ। এমনকি গায়েব হওয়া পণ্যের বিপরীতে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া শুল্কও ফেরত পাচ্ছেন না আমদানিকারকরা।
সর্বশেষ বন্দরের সিসিটি ইয়ার্ড থেকে গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানা 'গোল্ড স্টার গার্মেন্টস'-এর প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ের একটি কনটেইনার বের করে নিয়ে গেছে একটি জালিয়াত চক্র। ফ্রান্স থেকে আসা পাঁচ লাখ পিস লেডিস পোশাক রপ্তানির ক্রয়াদেশ রক্ষা করতে চীন থেকে এই কাপড় আমদানি করা হয়েছিল। ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে গত ৩০ আগস্ট বন্দরের ইয়ার্ডে ডেলিভারি নিতে গিয়ে আমদানিকারক জানতে পারেন কনটেইনারটি উধাও। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১১ আগস্ট আফরিনা ট্রেডিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কনটেইনারটি বের করে নেওয়া হয়েছে।
গোল্ড স্টারের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মোফাজ্জেল হোসেন মোল্লা জানান, সাইড পাওয়ার থেকে কনটেইনার কিপডাউন করতে না পেরে খোঁজাখুঁজি করার পর তারা জানতে পারেন যে পণ্যটি আগেই ডেলিভারি হয়ে গেছে। এ ঘটনায় এখন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশি বায়ারের অর্ডার বাতিলের আশঙ্কায় পড়েছেন রপ্তানিকারক।
ঘটনার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তিনটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের নাম। কনটেইনার নামানোর কিপডাউন স্লিপে 'আফরিনা ট্রেডিং'-এর নাম থাকলেও সেটি বের করে নেয় 'প্যারামাউন্ট ট্রেডিং' নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। অথচ কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেছিল 'সোনারগাঁও অ্যাসোসিয়েন্টস' নামে অন্য এক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, যা কাস্টমস ডকুমেন্টে ছিল ফলের চালান। ফলের চালান দেখিয়ে কীভাবে কাপড়ের কনটেইনার খালাস হলো, তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
আরেকটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান এসআরএস সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি হাফিজুর রহমান জানান, বিশেষ অনুমতি (অফসেস) দেখিয়ে একটি স্লিপের মাধ্যমে পণ্যটি বের করা হয়েছে, যেখানে সিঅ্যান্ডএফের নাম ও বিল অব এন্ট্রি নম্বরে সম্পূর্ণ অমিল রয়েছে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অভিমত, বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছাড়া মেকানিক্যাল ও ট্রাফিক বিভাগের সমন্বয়ে এত সুরক্ষিত এলাকা থেকে কনটেইনার পাচার অসম্ভব। চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক গোলাম রব্বানি রিগ্যান বলেন, "এগুলোর সাথে বন্দরের মেকানিক্যাল ও ট্রাফিক ডিপার্টমেন্টের লোকজন জড়িত। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে এটি করছে এবং এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।" গত দুই বছরে বন্দর থেকে অন্তত ১০টি কনটেইনার গায়েব হলেও একটিরও হদিস মেলেনি, পাননি কেউ ক্ষতিপূরণ।
প্রক্রিয়াগত শতভাগ যাচাই-বাছাইয়ের পরও কীভাবে এসব ঘটছে তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, কাস্টমসের প্রতিনিধি নিয়ে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পাশাপাশি চিহ্নিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে বন্দর ব্যবহারকারীদের স্পষ্ট দাবি—বন্দর ও কাস্টমসের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অটোমেশন ও শতভাগ ডিজিটাল না করা পর্যন্ত এই সংঘবদ্ধ জালিয়াতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।