রাজধানীর বুকে ফের জুয়া-মাদকের আসর
মোঃ মিলন, ঢাকা:
মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতি থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলে আবারও ডালপালা মেলছে নিষিদ্ধ ক্যাসিনো, জুয়া ও মাদকের রমরমা সিন্ডিকেট। ঐতিহ্যবাহী স্পোর্টিং ক্লাব থেকে শুরু করে নামিদামি আবাসিক হোটেল ঘিরে প্রতিদিন বসছে ক্যাসিনো স্টাইলের অবৈধ আসর। অভিযোগ উঠেছে, পুরো অপরাধ সাম্রাজ্য এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন ‘নাতি’ আনোয়ার নামের এক ব্যক্তি। তার গড়ে তোলা বিশাল সিন্ডিকেটের অবাধ তৎপরতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।
স্পোর্টিং ক্লাব ও হোটেলে অপরাধের আস্তানা
অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মতিঝিলের ঐতিহ্যবাহী ব্রাদার্স ইউনিয়নের তিনটি কক্ষ, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের চারটি কক্ষ এবং সুপরিচিত আবাসিক হোটেল কুরবানির একাধিক বিশেষ কক্ষে নিয়মিত বসছে জুয়া ও মাদকের আসর। সাধারণ ক্লাব কার্যক্রমের আড়ালে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব স্পটে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন চলছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
ফুট-ফরমায়েশ থেকে জুয়ার 'ডন'
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই অপরাধ সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন ‘নাতি’ আনোয়ার ও তার ভাই শাকিল। তাদের অধীনে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র ও সুসংগঠিত ক্যাডার বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে চাঁদপুর জেলার আলগী দুর্গাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম চর কৃষ্ণপুর এলাকা থেকে জীবিকার খোঁজে ঢাকায় আসেন আনোয়ার। শুরুতে আরামবাগ স্পোর্টিং ক্লাবের একটি জুয়ার আসরে ফুট-ফরমায়েশ খাটার কাজ করতেন তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে আন্ডারওয়ার্ল্ড ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। বিগত কয়েক বছরে রাজনৈতিক ছায়াতলে তিনি রাজধানী থেকে শুরু করে ঢাকা-চাঁদপুর নৌপথ কেন্দ্রিক জুয়া ও মাদকের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
প্রযুক্তির আড়াল ও বিপুল অবৈধ সম্পদ
দৃশ্যমান কোনো বৈধ ব্যবসা বা আয়ের উৎস না থাকলেও আনোয়ার এখন বিপুল অর্থ ও বিত্তবৈভবের মালিক। বিলাসবহুল গাড়ি ও আভিজাত্যপূর্ণ জীবনযাপন এখন তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তিনি গ্রহণ করেছেন অভিনব কৌশল; নিজের নামে কোনো মোবাইল সিম ব্যবহার না করে অন্যের নামে নিবন্ধিত একাধিক সিম দিয়ে পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন। নামসর্বস্ব সিম ব্যবহার ও তার যোগাযোগের ধরন দেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
হুমকি-ধমকি ও রহস্যজনক নীরবতা
এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে স্থানীয় কেউ প্রতিবাদ বা মুখ খুললেই নেমে আসে আনোয়ার বাহিনীর মিথ্যা মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি। ফলে আতঙ্কে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। অভিযোগ রয়েছে, লোকদেখানো অভিযানের পরিকল্পনা করা হলে আগেভাগেই সেই খবর চক্রটির কাছে পৌঁছে যায়, ফলে অভিযানের আগেই সটকে পড়ে অপরাধীরা।
সমন্বিত অভিযানের দাবি সচেতন মহলের
রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবাধ জুয়া ও মাদকের বিস্তার যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এলাকার সচেতন নাগরিকেরা অবিলম্বে লোকদেখানো অভিযানের পরিবর্তে ‘নাতি’ আনোয়ার ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহারের প্রযুক্তিগত তদন্ত এবং অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি উঠেছে।