মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি:
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশ এক নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে চীন তাদের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’ বা সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের আওতায় বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী লজিস্টিকস ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ের এই নতুন পরিকল্পনা আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক নতুন উত্তাপের জন্ম দিয়েছে।
ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের আধুনিক সমুদ্রভিত্তিক সংস্করণ হলো এই ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’, যার মাধ্যমে চীন প্রশান্ত মহাসাগর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত নিজেদের বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। এই কৌশলের অংশ হিসেবে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার সরাসরি সমুদ্র যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এখন কেবল কল্পনার বিষয় নয়, বরং বাস্তব রূপ লাভ করেছে।
এর আগে চীন থেকে পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় নিলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের নিংবো বন্দর থেকে সরাসরি কন্টেইনারবাহী জাহাজ রেকর্ড সময়ে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছানোর ঘটনা প্রমাণ করে যে লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইনে বিপ্লব ঘটতে চলেছে। এই সরাসরি রুট চালুর ফলে সময় ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশকে এক কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।
ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে কেবল সমুদ্রপথ নয়, বরং স্থলপথের করিডোর নিয়েও কাজ চলছে। চীন, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশকে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব ও কার্যক্রম এই ভূরাজনৈতিক খেলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কুনমিং থেকে শুরু করে মিয়ানমার হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই যোগাযোগ নেটওয়ার্ক চালু হলে তা কেবল দুই দেশের বাণিজ্যের পরিধি বাড়াবে না, বরং আসিয়ান (ASEAN) ভুক্ত দেশগুলোর বাজারের সাথেও বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত করে দেবে।
এই করিডোরগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক দূরত্ব কমানো এবং সাপ্লাই চেইনকে আরও বেশি চীন-কেন্দ্রিক বা আঞ্চলিকভাবে সুসংহত করা।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর কেবল বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরই নয়, বরং এটি সমগ্র অঞ্চলের ট্রানজিট ও বা বাণিজ্যের হাব হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। চীনের এই বিশাল পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘেরাও করে বা এর লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়িয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল কাজ করছে। চীনের এই অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টার্মিনাল আধুনিকায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর (যেমন—চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র) কূটনৈতিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশ এক সংবেদনশীল অবস্থানে উপনীত হয়েছে।
এই ভূরাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশের জন্য রয়েছে অপার সম্ভাবনা এবং একই সাথে কিছু চ্যালেঞ্জ। এক দিকে আধুনিক প্রযুক্তি, বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশ একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মোড়কে পরিণত হতে পারে; অন্য দিকে পরাশক্তিগুলোর এই শীতল লড়াইয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা কূটনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে এই 'মেরিটাইম সিল্ক রোড' ও অর্থনৈতিক করিডোরগুলোর সুফল দেশের অর্থনীতিতে কাজে লাগাতে হবে। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাল শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার মোড় ঘোরানো অধ্যায় হয়ে উঠবে কি না, তা দেখার জন্য আগামী দিনগুলোর কূটনৈতিক পদক্ষেপই মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।
এ জাতীয় আরো খবর..