মোঃ অলি উদ্দিন মিলন বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের সামগ্রিক আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। আইনি বিধিনিষেধকে তোয়াক্কা না করে নামসর্বস্ব ও কাগুজে প্রতিষ্ঠান গঠন এবং ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে এসব পরিবার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে বের করে নিয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র কয়েকটি পরিবারের কাছে পুরো ব্যাংক খাত জিম্মি হয়ে পড়ার ফলে পরিচালনা পর্ষদে সুশাসনের চরম অভাব, খেলাপি ঋণের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, মূলধন ঘাটতি এবং সার্বিক আর্থিক খাতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।
পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও শেয়ার দখলের কৌশল
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট পরিবার একক কোনো ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হতে পারে না। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন তদন্ত ও গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ম অমান্য করে শরিয়াহভিত্তিক ও বেসরকারি একাধিক ব্যাংকের সিংহভাগ শেয়ার বেনামে একটি বা একাধিক পরিবারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশের সর্ববৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারের বড় অংশ কাগজে-কলমে একাধিক সহযোগী ও কাগুজে কোম্পানির নামে ভাগ করে একটি একক গ্রুপের অধীনে নিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মেলে।
প্রভাবশালী এসব গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পরিচালিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে— মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কর্মাস (এসবিএসি) ব্যাংক, ফার্মার্স ব্যাংক (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক), ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।
নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে ঋণের পাহাড় ও মূলধন পাচার
ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে নিজেদের স্বজন ও অনুগত ব্যক্তিদের বসিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে
অনিয়মের বেশ কিছু ভয়াবহ চিত্র
জামানতহীন ঋণ বিতরণ: প্রচলিত ব্যাংকিং বিধিমালা ও ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন উপেক্ষা করে কোনো পর্যাপ্ত স্থাবর জামানত ছাড়াই বিশাল অঙ্কের তহবিল ছাড় করা হয়েছে।
পুনঃতফসিলের নামে খেলাপি গোপন: পর্ষদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বারবার নামমাত্র শর্তে ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল (Reschedule) করে মন্দ ঋণকে দীর্ঘদিন কাগজ-কলমে ‘ভালো ঋণ’ হিসেবে দেখানোর সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে।
অর্থ পাচারের অভিযোগ: ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নেওয়া ঋণের একটি বড় অংশ দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে ভুয়া আমদানির আড়ালে কিংবা বিভিন্ন অসাধু উপায়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিলতা ও আইনি দুর্বলতা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে শিথিলতা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় আইন বারবার সংশোধনের ফলেই এ ধরনের 'অলিগার্কি' বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। ইতিপূর্বে আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে একই পরিবার থেকে ব্যাংকের পর্ষদে একাধিক সদস্যের অন্তর্ভুক্তি এবং একটানা দীর্ঘদিন পরিচালক পদে বহাল থাকার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল, যা ব্যাংকিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনকে ধসিয়ে দিতে মূল ভূমিকা রাখে।
আমানতকারীদের চরম ঝুঁকি ও তারল্য সংকট
ব্যাংকের পরিচালন ফান্ডের সিংহভাগই সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ও আমানত। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের হাতে একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় আমানতকারীদের জমানো টাকা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। অনিয়ম ও মূলধন ঘাটতির কারণে ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংক দৈনন্দিন নগদ টাকার সংস্থান করতে না পেরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তারল্য সহায়তা (Liquidity Support) ও জরুরি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সংকট নিরসনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা আনতে পারিবারিক
আধিপত্য খর্ব:
পরিচালনা পর্ষদে এক পরিবারের সদস্য সংখ্যা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব কঠোর আইনি সংশোধনীর মাধ্যমে দ্রুত সীমিত করা।ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা পৃথকীকরণ: ব্যাংকের পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, যাতে ঋণ প্রস্তাবনা যাচাই ও অনুমোদনে পর্ষদের অন্যায্য হস্তক্ষেপ না থাকে।
ফরেনসিক অডিট ও অর্থ উদ্ধার: আন্তর্জাতিক মানের নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এবং পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা।স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক: বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপমুক্ত রেখে পূর্ণ স্বাধীনভাবে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার ও ক্ষমতা প্রদান।
ব্যাংক খাতের এই সংকট কেবল আর্থিক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি নড়বড়ে করে দিচ্ছে। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে দৃশ্যমান ও কঠোর সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা
এ জাতীয় আরো খবর..