যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র সংকটের কূটনৈতিক সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার পরপরই তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। খবর বিবিসি।
এর আগে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের এই প্রস্তাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, ইরান বর্তমান সংঘাতে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় দ্রুত সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছে এবং সেই কারণেই মাত্র সাত দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি করতে চাইছে।
ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছেন। তার দাবি, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান
ট্রাম্পের প্রস্তাব নাকচ করার বিষয়টি পরবর্তীতে টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় স্বীকার করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত জবাব আসার আগে তেহরান শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। ট্রাম্পের অতীত বক্তব্যগুলোর দ্বিমুখী নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানার পরই তেহরান তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
আব্বাস আরাগচি আরও জানান, হরমুজ প্রণালি চালুর বিষয়ে ইরানের যে শর্তগুলো রয়েছে, সেগুলোর রূপরেখা গত জুনে উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশন ও পেজেশকিয়ানের বক্তব্য
গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং চলমান সংঘাত বন্ধের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরে ইরান। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, আলোচনা সফল করতে হলে উভয় পক্ষের মধ্যকার যুদ্ধের অবিশ্বাস দূর করতে হবে। জুন মাসের সমঝোতা স্মারকটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে এজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তারা ইরানের বর্তমান সরকার উৎখাতে বিশ্বাসী নয়।
যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় বিমান হামলা চালিয়ে সেই সমঝোতা চুক্তি নস্যাৎ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন পেজেশকিয়ান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি লিখিত সমঝোতার শর্তগুলোই রক্ষা না করা হয়, তবে কেবল সংলাপের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান কীভাবে আশা করা যায়?
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির স্বাস্থ্য নিয়ে চলা গুঞ্জন প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান জানান, তিনি সর্বোচ্চ নেতার সাথে দুবার সাক্ষাৎ করেছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন হামলায় তার বাবা নিহত হওয়ার সময় মোজতবা সামান্য আহত হলেও বর্তমানে তার বড় ধরনের কোনো স্বাস্থ্য জটিলতা নেই এবং তিনি দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করার মতো সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
ওমানের মধ্যস্থতা ও ন্যাটোর সমর্থন
এই সংকট নিরসনে দুই পক্ষের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান নিয়মিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর বিন হামাদ বিন হামুদ আলবুসাইদি সব পক্ষকে উন্মুক্ত সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে ওমানের পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক মহলের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি সমর্থন জানিয়েছেন ন্যাটোতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ হুইটেকার। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে ইরান নানা অবাস্তব ও অসম্পূর্ণ চুক্তি প্রস্তাবের কৌশল নিয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসন মেনে না নিয়ে সঠিক কাজই করেছে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’
ইরানের ওপর চাপ আরও তীব্র করতে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন অর্থনৈতিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে, যা ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে পরিচিত। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেন, কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলস্বরূপ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দিন দিন বাড়ছে। তার দাবি অনুযায়ী, তুরস্ক, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে ইরানের বেশ কিছু এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে এবং কিছু ব্যাংক তেহরানের সাথে লেনদেন স্থগিত করেছে।
তবে এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই অবরোধের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে চীনের মতো প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের প্রতিক্রিয়ার ওপর—যেহেতু চীন বরাবরই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল আমদানি করে আসছে।
এ জাতীয় আরো খবর..