×
সদ্য প্রাপ্ত:
সাইবার অপরাধ দমনে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব বৃদ্ধির উদ্যোগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের : যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে সমর্থন জানালেন তারেক রহমান সীতাকুণ্ডে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ সার জব্দ, আটক ২ ২৪ ঘন্টায় হাম উপসর্গে প্রাণ গেল আরও ৫ শিশুর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে একযোগে অভিযানে আটক ৬২৪ গঙ্গার পানিবণ্টনে নতুন চুক্তি চায় বাংলাদেশ: পানিসম্পদমন্ত্রী হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায় চৌধুরী নাশকতায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার ভারতীয় নাগরিক ৪ দিনের রিমান্ডে জ্বালানির দাম বাড়ায় ক্ষোভে উত্তাল সারাদেশ
  • প্রকাশিত : ২০২৬-০৯-২৭
  • ১৭ বার পঠিত
বিশেষ প্রতিবেদন
প্রণয় দাশগুপ্ত শিমুল | চট্টগ্রাম ব্যুরো

বোয়ালখালী থেকে চট্টগ্রাম শহরের দূরত্ব মাত্র ২০ মিনিটের। গুগল ম্যাপে ১২ কিলোমিটার। কিন্তু বাস্তবে এই ১২ কিলোমিটার পাড়ি দিতে সময় লাগে ২ ঘণ্টা, কখনো আড়াই ঘণ্টা। কারণ একটাই - কালুরঘাট সেতু। বোয়ালখালীবাসীর জন্য এই সেতু এখন উন্নয়নের প্রতীক নয়, বরং এক অভিশাপের নাম।

১৯৩১ সালে ব্রিটিশরা কর্ণফুলী নদীর ওপর যে রেল সেতুটি বানিয়েছিল, তার মেয়াদ ছিল ৫০ বছর। আজ ২০২৬ সালে এসে সেই সেতুর বয়স ৯৫ বছর। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় তিন যুগ আগে। তবুও ১০ লাখ মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই মৃত্যুফাঁদ।

যান্ত্রিক কষ্টের বাস্তব চিত্র*

সকাল ৮টায় বোয়ালখালী থেকে একজন গার্মেন্টস কর্মীকে চট্টগ্রাম ইপিজেডে যেতে হয়। বাসা থেকে বের হন সকাল ৬টায়। কালুরঘাট সেতুর মুখে এসে দেখেন দীর্ঘ লাইন। একদিকে ট্রেন যাবে বলে সেতু বন্ধ। অন্যদিকে শত শত গাড়ি, বাইক, টেম্পো, রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। তীব্র গরমে, ধুলায়, ট্রেনের হুইসেলে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা। ট্রেন যাওয়ার পর যখন সেতু খোলে, শুরু হয় আরেক যুদ্ধ।

সেতুটি এতটাই সরু যে, একসাথে দুটি গাড়ি পাশাপাশি যেতে পারে না। এক পাশের গাড়ি গেলে অন্য পাশের গাড়িকে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে সৃষ্টি হয় ২-৩ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। এই যানজটে আটকে থাকা একজন রোগীর গল্প শুনুন। গত মাসে পোপাদিয়ার এক গর্ভবতী নারীকে নিয়ে তার স্বামী অ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রাম মেডিকেলে যাচ্ছিলেন। কালুরঘাট সেতুর যানজটে ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট আটকে ছিল অ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সন্তান নষ্ট হয়। এমন ঘটনা বোয়ালখালীতে এখন অহরহ।

মৃত্যুফাঁদে প্রতিদিন পারাপার*

এই সেতুতে প্রতিনিয়ত ঘটছে ভয়ংকর দুর্ঘটনা। সেতুর দুই পাশে কোনো ফুটপাত নেই। মানুষকে হেঁটে পার হতে হয় গাড়ির পাশ দিয়ে। যখনই গাড়ি একদিকে চলে, অন্যদিক থেকে অনেক ঝুঁকি নিয়ে বাইক চলতে শুরু করে। রেলিংগুলো এতটাই দুর্বল যে, ধাক্কা লাগলেই ভেঙে নদীতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি। গত ২ বছরে অন্তত ৭টি গাড়ি রেলিং ভেঙে নদীতে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে লাইনম্যানের দায়িত্বহীনতা। অনেক সময় রেল চলন্ত অবস্থায় ভুল করে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়া হয়। চলন্ত ট্রেন এসে গাড়িকে গুঁড়িয়ে দেয়। গত ৫ বছরে এমন ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১২ বার, যেখানে প্রাণ হারিয়েছে ৮ জন। গত বছর একটি যাত্রীবাহী বাস সেতুর ওপর বিকল হয়ে ৩ ঘণ্টা আটকে ছিল। দুই পাশে তীব্র যানজট ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ভোটের তুরুপের তাস*

এলাকাবাসীর ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি জনপ্রতিনিধিদের ওপর। তাদের অভিযোগ, প্রতিবার যখন ভোট আসে তখনই প্রত্যেক প্রার্থী এই কালুরঘাট সেতুকে বানায় তুরুপের তাস। বোয়ালখালীবাসীকে বারবার স্বপ্ন দেখানো হয় নতুন সেতু তৈরি করার। কিন্তু ভোট শেষ হলেই সব প্রতিশ্রুতি ভুলে যায় সবাই।

"আমরা কি বাংলাদেশের নাগরিক না? আমাদের কি উন্নয়নের অধিকার নেই?" - ক্ষোভের সাথে বলেন বোয়ালখালীর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। "প্রতিবার শত কোটি টাকা খরচ করে এই পুরনো সেতুকে রং করা হয়। এই টাকা দিয়ে তো নতুন সেতুর পিলার হয়ে যেত। এটা সরকারের অশুভ দৃষ্টি বোয়ালখালীর প্রতি।"

এই সেতুর কারণে বোয়ালখালী অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। শিল্প-কারখানা থাকা সত্ত্বেও শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীরা আসতে চায় না। সঠিক সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পেরে চাকরি হারিয়ে অনেকে এখন বেকার।

নতুন সেতুর আলো*

তবে এবার আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সরকার নতুন কালুরঘাট সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সহযোগিতা তহবিল (EDCF) এর অর্থায়নে ৭০০ মিটার দীর্ঘ মূল সেতুসহ প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেল কাম সড়ক সেতুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে থাকবে ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাক রেললাইন ও দুই লেনের সড়ক। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই সেতুর কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫টি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান থেকে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।

বোয়ালখালীবাসীর এখন একটাই দাবি, আর কোনো জোড়াতালি নয়, আর কোনো ভোটের প্রতিশ্রুতি নয়। দ্রুততম সময়ে নতুন সেতু নির্মাণ করে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া হোক।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...
❮

❯
Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat