মোঃ অলি উদ্দিন মিলন ঢাকা
আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির মাঝে কোটি টাকার রাজনৈতিক প্রদর্শনী
দেশে চাল, ডাল, তেল ও ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামে যখন সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, ঠিক তখনই রাজপথে জোটবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর বিপুল অর্থব্যয়ে আয়োজিত ‘লং মার্চ’ কর্মসূচি নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের দৈনিক সংসার চালানো যেখানে দায় হয়ে পড়েছে, সেখানে শত শত বিলাসবহুল গাড়ির বহর, ব্যাপক মাইকিং, রঙিন তোরণ আর কোটি কোটি টাকার শো-ডাউনকে সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহল চরম অসংবেদনশীল পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
বিলাসবহুল বহর ও বিপুল অঙ্কের বাজেট
কর্মসূচি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ঘোষিত এই দীর্ঘযাত্রায় নামানো হয়েছে শত শত বিলাসবহুল জিপ, মাইক্রোবাস, বড় বাস ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ বহর। বহরের জ্বালানি খরচ, বিশাল আকারের ব্যানার-ফেস্টুন, সড়ক জুড়ে তোরণ নির্মাণ, প্রচার-প্রচারণা এবং অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের আনুষঙ্গিক আপ্যায়ন ব্যয়ের পেছনে একটি বিশাল বাজেট খরচ করা হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে এ ধরনের আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের দূরত্বেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিত্যপণ্যের বাজারে হাহাকার ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে খেটে খাওয়া মানুষ ও পথচারীদের সাথে কথা বলে চরম অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "বাজারে এক কেজি চাল কিংবা এক লিটার তেল কিনতে গেলে পকেটে টান পড়ে। চাল-ডালের দামের সাথে ওষুধ আর বাচ্চার পড়াশোনার খরচ মেলাতে পারি না। অথচ রাজপথে গাড়ি আর জ্বালানির নদে ভাসিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে। এই টাকাগুলো দিয়ে যদি দুস্থদের সাহায্য করা হতো বা বাজার দর নিয়ন্ত্রণে কোনো তহবিল করা হতো, তবে মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পেত।" অনেক সাধারণ নাগরিকের মতে, চরম জনদুর্ভোগের দিনে এভাবে কোটি টাকার শক্তি প্রদর্শন এক ধরনের উপহাসের সামিল।
অর্থনৈতিক দিক ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বর্তমানে যে ধরনের মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ বিদ্যমান, তাতে এ জাতীয় বিপুল অর্থপ্রবাহ রাজপথে অপচয় করা অর্থনৈতিক যুক্তিসঙ্গত নয়। বিশাল বহরের পেছনে যে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, তা সরাসরি অনুৎপাদনশীল খাত। নাগরিক সমাজের মতে, রাজনৈতিক শো-ডাউনে এই বিপুল অর্থ ব্যয় না করে যদি সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে দুস্থ ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মাঝে জরুরি খাদ্য সহায়তা বা কল্যাণমূলক কাজ করা হতো, তবে প্রান্তিক মানুষ উপকৃত হতো। তদুপরি, সুবিশাল এই গাড়িবহরের কারণে রাজধানীসহ মহাসড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
রাজপথ ছেড়ে সংসদমুখী হওয়ার তাগিদ
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সভা-সমাবেশ বা আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও সংকটকালে কর্মসূচির ধরণ বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। রাজপথে বিপুল অর্থ ঢেলে শক্তি প্রদর্শন বা রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি করে মূল্যস্ফীতি বা অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। জাতীয় অর্থনৈতিক নীতি, বাজার সিন্ডিকেট দমন ও নিত্যপণ্যের দাম কমানোর মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সমাধান হতে হবে জাতীয় সংসদের টেবিলে।
জনমুখী ও দায়িত্বশীল রাজনীতির আহ্বান
রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে রাজপথের ব্যয়বহুল আড়ম্বর বর্জন করতে হবে। জনগণের কষ্টের দিনে রাজপথের আড়ম্বরপূর্ণ প্রদর্শনী এড়িয়ে সংসদের ভেতরে গঠনমূলক আলোচনা, সংসদীয় বিতর্ক ও নীতি নির্ধারণী উদ্যোগ গ্রহণ করাই দায়িত্বশীল রাজনীতির মূল পরিচায়ক।
এ জাতীয় আরো খবর..