বিশেষ প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে আবারও নতুন করে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে তীব্র মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি প্রধান তারেক রহমান। তবে কোনো অপশক্তি বা ষড়যন্ত্রই এ দেশের গণতন্ত্রকামী মুক্তিকামী মানুষকে স্তব্ধ করে রাখতে পারবে না বলে দৃঢ় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি। অতীতের ঐতিহাসিক দিনগুলোর মতো এবারও সব ষড়যুদ্ধে যুক্ত থাকা চক্রকে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আজ শনিবার (৭ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত সুবিশাল ‘সার্বভৌমত্ব’ র্যালি-পূর্ব সংক্ষিপ্ত মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ডাক দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে আবারও ষড়যন্ত্রের পাঁয়তারা চলছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো এবারও প্রতিটি চক্রান্তের দাঁতভাঙা জবাব প্রদান করা হবে। এ দেশের আপামর গণতন্ত্রকামী জনগণকে সাথে নিয়েই আমরা সব দেশবিরোধী চক্রান্তের কড়া জবাব নিশ্চিত করব।”
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তিনি বলেন, “একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মতোই আমরা আবারও শত্রুদের দাঁতভাঙা জবাব দিতে প্রস্তুত। আজকের এই ৭ নভেম্বরের ‘সার্বভৌমত্ব র্যালি’ হোক সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের প্রতিশ্রুতি। এই র্যালিটি হোক বাংলাদেশের অখণ্ড স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ন রাখার দীপ্ত শপথ।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের বীর ছাত্র-জনতা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও প্রতিষ্ঠা করেছে, আজকের এই দিনটি হোক সেই অর্জিত গণতন্ত্র রক্ষার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার দিন।”
নয়াপল্টনে সমবেত সুবিশাল জনসমুদ্রে উপস্থিত লাখো নেতাকর্মী ও সমর্থকের উদ্দেশ্যে সরাসরি সমর্থন চেয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “আপনারা কি আমাদের এই ন্যায়সংগত সংগ্রামের সাথে আছেন?” এ সময় পুরো নয়াপল্টন এলাকা জুড়ে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষ প্রবল করতালি ও স্লোগানের মাধ্যমে তাঁর প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, “দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একযোগে ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। তবে এ দেশের স্বাধিকারকামী জনগণকে সাথে নিয়ে সকল অশুভ চক্রান্ত ধুলিসাৎ করে দেওয়া হবে।”
৭ নভেম্বরের চিরন্তন গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “৭ নভেম্বর হচ্ছে মূল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, ৭ নভেম্বর হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার দুর্গ এবং ৭ নভেম্বর হলো বাংলাদেশের কোটি মানুষের আশা ও আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের দিন।”
বক্তব্যের এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে উদ্যমী হয়ে স্লোগান ধরেন। তিনি উচ্চারণ করেন, “দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।”
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা কেবল দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারই করেনি, বরং ফ্যাসিবাদের স্বৈরাচার ও ষড়যন্ত্রকারীদের এ দেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করেছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—উভয় সময়েই সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও বাঁধভাঙা আন্দোলনের মুখে অপশক্তি ও ষড়যন্ত্রকারীরা একইভাবে চূড়ান্ত পরাজয় বরন করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অতীতের অপশক্তি এখনো তৎপর রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আবারও একদল চক্রান্তকারী বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্বকে খর্ব করতে চায় এবং দেশে ফের ‘আমি-ডামি’ ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চায়। তবে সেই ধরনের অনৈতিক সুযোগ এ দেশের মাটিতে আর কাউকে দেওয়া হবে না।”
তিনি সুদৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “যে দেশের বীর জনতা ১৯৭১ সালে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করতে জানে, যে দেশের মানুষ ১৯৭৫ সালে ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার গণ-বিপ্লব ঘটাতে পারে এবং যে দেশের তরুণেরা ২০২৪ সালে রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে স্বৈরাচারকে উৎখাত করতে পারে—সে দেশের মানুষকে কোনো ষড়যন্ত্র করেই দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”
এর আগে, বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সুসজ্জিত অস্থায়ী মঞ্চে এসে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী। ওই সময় মঞ্চে তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
সমাবেশস্থলে দুপুর ১২টা থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ছোট ছোট সুসংগঠিত মিছিল নিয়ে নয়াপল্টনে জড়ো হতে থাকেন দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মী। বেলা বাড়ার সাথে সাথে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে রাজধানীর কাকরাইল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত সমগ্র পথ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। রাজপথে নামা মানুষের হাতে ছিল বাংলাদেশের লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলোকচিত্র সংবলিত সুদৃশ্য প্ল্যাকার্ড। বর্ণিল রঙের ক্যাপ ও গেঞ্জি পরিধান করে শোভাযাত্রায় অংশ নেন বিপুল সংখ্যক সমর্থক।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ ও বক্তব্য প্রদান শেষে নিজ পায়ে হেঁটে বিশাল এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পথচলার সময় সড়কের উভয় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ উৎসুক মানুষের অভিবাদনের জবাবে তিনি হাত উঁচিয়ে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন। পরবর্তীতে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শোভাযাত্রাটি জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হয় এবং সেখানে সমাপনী বক্তব্য দেন তারেক রহমান। সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দসহ বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ নেতারা তাঁর সাথে পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন।