মুজাহিদ হোসেন, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি
ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, আদালতের আদেশ উপেক্ষা, ফৌজদারি মামলার আসামিকে বেআইনি আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং নির্বাচনে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগের মধ্যে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রেজাউল করিমকে (পরিচিতি নং-১৯১৭৫) প্রত্যাহার করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে নিয়ামতপুর থেকে সরিয়ে পরবর্তী পদায়নের জন্য রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সহকারী সচিব মো. বরমান হোসেন স্বাক্ষরিত ওই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারি নথিতে রেজাউল করিমের পরিচিতি নম্বর ১৯১৭৫ উল্লেখ রয়েছে। জেলা প্রশাসক, নওগাঁ; অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), নওগাঁ এবং রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে দেওয়া বিভিন্ন লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নিয়ামতপুরে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, উপজেলার রাসুলপুর-পাঁড়ইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) মাহবুব আলম একটি ফৌজদারি মামলায় (সিআর ৮২৪/২০২৩, মান্দা) প্রায় এক সপ্তাহ হাজতবাস করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, হাজতবাসের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে তাঁকে দায়িত্বে বহাল রাখা হয়। পরে ওই কর্মকর্তার মাধ্যমে নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ক্ষেত্রে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে বিজয় মহন্ত নামে এক বহিরাগত ব্যক্তিকে ভূমি অফিসের কার্যক্রমে প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, নিয়ামতপুর উপজেলার খাস ও বদ্ধ জলমহালের সরকারি পুকুর ইজারা এবং খাস কালেকশন কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে। এমনকি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বিরোধপূর্ণ পুকুর-জলাশয় লিজ ও খাস কালেকশনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলার বনগাঁপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আতাহার আলী বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তিনি অনিয়ম, দুর্নীতি ও মামলার আসামিকে বেআইনি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানান।
অন্যদিকে, উচ্চ আদালতে বিচারাধীন একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ ও বিচারাধীন বিষয়ের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিবিধ মামলায় আদেশ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী আব্দুল কাইউম নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগও করা হয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি একজন প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে অপর প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন। নিয়ামতপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষের প্রচারসামগ্রী সরিয়ে ফেলার জন্য দলটির নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এর পাশাপাশি তিন হাজার লিটার অবৈধ ডিজেল জব্দের পর এর মধ্যে দুই হাজার লিটার গোপনে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্তের আবেদন করা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানা যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাদের দাবি, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে অনুসন্ধান হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
এ জাতীয় আরো খবর..