মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের একবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এর আশেপাশের কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্য করে শক্তিশালী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে। এই ঘটনার পর রিয়াদের আকাশে রহস্যজনক কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যাওয়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে চরম আতঙ্ক ও কূটনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা না হলেও, এই আকস্মিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এক নতুন ও বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত রবিবার সৌদির রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং এর সংলগ্ন কৌশলগত নিরাপত্তা জোনগুলোর কাছাকাছি এলাকায় আকস্মিক তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর পরপরই বিমানবন্দরের আশপাশের আকাশ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যা স্থানীয় বাসিন্দা এবং যাতায়াতকারী যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক মুখপাত্র দাবি করেছেন যে, তারা অত্যন্ত নিখুঁত ও দূরপাল্লার বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন ব্যবহার করে রিয়াদের ওই সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট বা দেশটির বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এই হামলার সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি বা আটকের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি, তবে বিমানবন্দর এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আকাশসীমার নিরাপত্তায় ডিফেন্স সিস্টেমগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের পক্ষ থেকে বারবার সৌদি আরবের তেল স্থাপনা এবং বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত, বিশেষ করে গাজা ও লেবাননের পরিস্থিতির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ এবং ইয়েমেনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ ও সামরিক অভিযানের জবাব হিসেবেই তারা এই ধরনের হামলা চালাচ্ছে বলে হুথি নেতৃত্ব বারবার দাবি করে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সৌদি আরব যখন দেশটির ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়ে এই ধরনের হামলা দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। রিয়াদের মতো সুরক্ষিত ও জনবহুল রাজধানীতে এ ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘন সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সৌদি আরবের রাজধানী ও এর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এমন একটি হামলার খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে এর তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এই উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা মানেই বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা।
এর পাশাপাশি, ইয়েমেনে দীর্ঘ শান্তি আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর যে ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, হুথিদের এই নতুন আগ্রাসী পদক্ষেপ তা নস্যাৎ করে দিতে পারে বলে কূটনীতিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্ররাও এই ঘটনার ওপর গভীর নজর রাখছে এবং সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।