মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, টঙ্গী এবং নারায়ণগঞ্জের মতো দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে সাংবাদিকতা ও মানবাধিকারের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে চলছে নজিরবিহীন ‘আইডি কার্ড’ বাণিজ্য। নামসর্বস্ব ও অনিবন্ধিত কিছু অনলাইন পোর্টাল, ভুঁইফোড় আইপি টিভি এবং সাইনবোর্ডসর্বস্ব মানবাধিকার সংগঠনের ছত্রছায়ায় নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হচ্ছে এসব পরিচয়পত্র। নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশাদারিত্বের বালাই না থাকায় এই অপতপরতা কেবল সাধারণ মানুষকে জিম্মিই করছে না, বরং চরমভাবে কলঙ্কিত করছে মহান সাংবাদিকতা পেশাকেও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অপতৎপরতার পেছনে সক্রিয় রয়েছে বেশ কিছু অসাধু সিন্ডিকেট।
অতীতে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং কালচার, ছিনতাই বা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরাও এখন গলায় এসব কার্ড ঝুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
স্থানীয় বিভিন্ন অটোরিকশা, লেগুনা চালক কিংবা নানা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে অবৈধভাবে ‘প্রেস’, ‘সাংবাদিক’ বা ‘মানবাধিকার’ স্টিকার লাগিয়ে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
চেকপোস্ট বা তল্লাশি চৌকিতে এই কার্ড দেখিয়ে সহজেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাওয়ার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনের আড়ালে বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও হয়রানি
সাংবাদিকতার পাশাপাশি বর্তমানে বিভিন্ন ভুয়া মানবাধিকার সংগঠনের আড়ালে চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলিং মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শিল্পাঞ্চলের কারখানা মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিনিয়ত এসব চক্রের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
সামান্য কোনো সামাজিক ঘটনা, দুর্ঘটনা বা শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে এসব ভুয়া চক্র দলবেঁধে ঘটনাস্থলে হাজির হয়।
মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া বা প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করাই এদের মূল পেশা। চাঁদা না পেলে মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়া হয়।
এই লাগামহীন কার্ড বাণিজ্যের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মাঠপর্যায়ের প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকরা। বছরের পর বছর ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সত্য তুলে ধরা গণমাধ্যমকর্মীরা আজ ভুয়া সাংবাদিকদের কারণে সমাজে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন।
অপেশাদার ও চাঁদাবাজদের অপকর্মের দায় এসে পড়ছে মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর, যা সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরাচ্ছে।
অপরাধীরা যখন গাড়িতে বা মোটরসাইকেলে ‘প্রেস’ বা ‘সাংবাদিক’ স্টিকার ব্যবহার করে ঘুরে বেড়ায়, তখন প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা এবং সার্বিক জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও এক চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
সাংবাদিকতার পবিত্রতা রক্ষা এবং জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে এই সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল, নাগরিক সমাজ এবং পেশাদার সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতারা।
তাদের মতে, অবিলম্বে যা করা প্রয়োজন:
যেসব অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল ও নামসর্বস্ব মানবাধিকার সংগঠন অর্থের বিনিময়ে কার্ড বিতরণ করছে, তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি-র সহযোগিতায় তাদের তালিকা তৈরি করে অবিলম্বে সিলগালা করা।
প্রেস কাউন্সিলের নীতিমালা অনুযায়ী বৈধ সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত সাংবাদিকদের তালিকা বা প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের কার্যকারিতা জোরদার করা।
গাড়ি ও মোটরসাইকেলে যত্রতত্র ‘প্রেস’ বা ‘সাংবাদিক’ স্টিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও ট্রাফিক পুলিশের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
চাঁদাবাজ ও ভুয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা, যাতে কেউ মহান পেশাকে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সাহস না পায়।
এ জাতীয় আরো খবর..