নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মরত হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির বৈধ রেসিডেন্স ভিসা হুট করে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে (অটো-ক্যানসিলেশন) বাতিল হয়ে যাওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে তীব্র অসন্তোষ ও চরম মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে অভিবাসন নীতি ও ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনায় কিছু অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আনার পর এই জটিলতা দেখা দেয়। ছুটির দিনে দেশে আসা কিংবা আমিরাতে নিয়মিত কর্মস্থলে অবস্থানরত বহু প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ বহাল থাকা সত্ত্বেও সিস্টেমের ত্রুটি বা নতুন নিয়মের মারপ্যাচে তা বাতিল হয়ে গেছে।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে যে, অনেক প্রবাসী বিমানবন্দর বোর্ডিং গেটে বা কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারছেন তাদের রেসিডেন্স ভিসা আর বৈধ নেই। এর ফলে বহু কর্মীর রিটার্ন টিকিট নষ্ট হয়েছে, অনেকে দীর্ঘক্ষণ বিমানবন্দরে আটকে থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং অনেকের চাকরি হারানোর উপক্রম হয়েছে। মরুর বুকে তপ্ত রোদে ঘাম ঝরিয়ে দেশ ও পরিবারের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা হঠাৎ এমন আকস্মিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। প্রবাসীদের অভিযোগ, আমিরাত কর্তৃপক্ষের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত এবং কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা নোটিশ না দেওয়ায় তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এই আকস্মিক ভিসা বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে ও প্রবাসে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক রুটে হঠাৎ টিকিটের তীব্র কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে। আকস্মিক ভিসা জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত কর্মস্থলে ফেরার তাগিদে প্রবাসীরা যখন মরিয়া হয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে যাচ্ছেন, তখন সিন্ডিকেটগুলো সাধারণ মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি দামে টিকিট বিক্রি করছে।
অনেকে জমি বিক্রি করে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বা গহনা বন্ধক রেখে দ্বিগুণ দামে টিকিট কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ খেটে খাওয়া প্রবাসীরা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রবাসীদের জোরালো দাবি ছিল—এই সংকটময় মুহূর্তে যেন টিকিটের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং প্রবাসী যাত্রীদের বিশেষ কোটায় সহজ শর্তে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তদারকির অভাবে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হওয়ায় প্রবাসীদের ক্ষোভ দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে লাখ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হওয়ায় এই সংকটে দ্রুত নড়েচড়ে বসেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস যৌথভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠে নেমেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবল বাংলাদেশ নয়, আমিরাত সরকারের অভ্যন্তরীণ অটোমেশন এবং ইমিগ্রেশন পলিসির নতুন নিয়মের কারণে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের ওপরই এর প্রভাব পড়েছে।
সংকট নিরসনে আমিরাত সরকারের শ্রম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ দূতাবাস। যেসব প্রবাসীর ভিসা বৈধ থাকা সত্ত্বেও ভুলবশত বা সিস্টেমের ত্রুটির কারণে বাতিল হয়েছে, তাদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে আমিরাত সরকারের সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। দূতাবাস থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের জন্য বিশেষ হটলাইন চালু করা হয়েছে, যেখান থেকে ২৪ ঘণ্টা আইনি ও প্রশাসনিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে খুব দ্রুতই এই জট ছাড়িয়ে প্রবাসীদের স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফেরার পথ সুগম করা হবে।
দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল এবং আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের এই আকস্মিক দুর্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে, যা প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসীর অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধান করছে। হটলাইন নম্বরগুলোতে অতিরিক্ত অপারেটর নিয়োগ করা হয়েছে যাতে কোনো প্রবাসী সহায়তার বাইরে না থাকেন।
কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা আমিরাতের ফেডারেল অথরিটি ফর আইডেন্টিটি, সিটিজেনশিপ, কাস্টমস অ্যান্ড পোর্ট সিকিউরিটি (ICP)-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। যেসব প্রবাসীর ভিসা রি-ইস্যু করার প্রয়োজন, তাদের দ্রুত কাগজপত্রের কাজ সম্পন্ন করতে দূতাবাস থেকে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি, যেসব কর্মী ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া বা বাতিলের কারণে ওভারস্টে বা আইনি জটিলতায় পড়ার ঝুঁকিতে আছেন, তাদের জরিমানা মওকুফ বা আইনি সুরক্ষা পেতে আমিরাত সরকারের অভিবাসন বিভাগের সঙ্গে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে মিশনগুলো।
এই আকস্মিক ভিসা বাতিলের প্রতিবাদে এবং এর স্থায়ী সমাধানের দাবিতে সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে প্রবাসীরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। আমিরাতের বিভিন্ন সিটিতে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিরা একত্রিত হয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা চেয়ে স্লোগান দেন। তারা বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দিয়েই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে, অথচ সামান্য নীতিগত জটিলতায় তাদের আজ পথের ভিখারি হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এদিকে, দেশে এবং প্রবাসে থাকা বিভিন্ন জনশক্তি উন্নয়ন সংগঠন ও প্রবাসী কল্যাণ ফোরাম সরকারের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছে যেন কূটনৈতিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে আমিরাত সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হয়। সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং এয়ারলাইনস সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় ও ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজারে এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক ডিজিটাল ও প্রশাসনিক সংকট এড়াতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি রিয়েল-টাইম ডেটা মনিটরিং সেল থাকা জরুরি, যা বিদেশের ইমিগ্রেশন পলিসির যেকোনো পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের কর্মীদের তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করতে পারবে।
পরিশেষে, বর্তমান সংকট উত্তরণে সরকার ও কূটনৈতিক মহলের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের গুজবে কান না দিয়ে কেবল বাংলাদেশ দূতাবাস ও নির্ভরযোগ্য সরকারি মাধ্যমের নির্দেশিকা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সঠিক সমন্বয় এবং কঠোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই ভিসা জটিলতার স্থায়ী অবসান ঘটবে এবং প্রবাসীদের জীবন ও কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।