নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
শিশুদের নিজেদের প্রতিভা ও গুণাবলি বিকাশের উপযুক্ত সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলে তবেই দেশের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় ও মজবুত হবে বলে জোরালো মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে ‘শিশু অধিকার দিবস ২০২৬’ এবং ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি (সুবর্ণজয়ন্তী)’ উপলক্ষে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য ও উৎসবমুখর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি
শিশুদের দ্বারা বরণ: নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে এসে পৌঁছালে ১৫০ জন খুদে শিশু প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়। এর পর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
বিশেষ উপস্থিতি: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান।
মূল প্রতিপাদ্য: এবারের শিশু অধিকার দিবসের নির্ধারিত মূল প্রতিপাদ্য ছিল— ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’।
প্রধানমন্ত্রীর শৈশবের স্মৃতিচারণ ও নস্টালজিয়া
শিশু অতিথি হিসেবে অতীত স্মৃতি: অনুষ্ঠানের শুরুতে বড়দের প্রথাগত দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে শিশুদের কথা ও পরিবেশনা শোনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় নিজের শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, আজকের এই শিশুরা যেমন আনন্দ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, তিনিও একদিন শিশু অতিথি হিসেবে এই শিশু একাডেমিতে এসেছিলেন।
‘শিশু’ ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশের স্মৃতি: স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, শিশু একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনা ‘শিশু’ ম্যাগাজিনে তাঁর ও তাঁর ছোট ভাইয়ের লেখা অতীতে প্রকাশিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি বিশেষ বোর্ডে নিজের ও ভাইয়ের সেই পুরনো লেখা দেখতে পেয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ার কথাও তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরেন।
খেলাধুলা, শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চার বহুমুখী বিস্তার
পড়াশোনার বাইরে আনন্দময় শৈশব: শিশুদের শুধু গতানুগতিক পড়াশোনার চারদেয়ালে বন্দি না রেখে খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি এবং সংগীতচর্চার উন্মুক্ত অঙ্গনে ছড়িয়ে দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।
ফুটবল প্রতিযোগিতায় রেকর্ড অংশগ্রহণ: শিশুদের শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনে প্রাথমিক পর্যায় থেকে দেশব্যাপী সুপরিকল্পিতভাবে খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকে সারা দেশে প্রায় ২২ লাখ শিশু—যার মধ্যে ১১ লাখ ছেলে ও ১১ লাখ মেয়ে—ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে বলে জানান তিনি। এই ধরনের নিয়মিত আয়োজন থেকে অদূর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুযোগের সমতা ও নতুন রূপরেখা
সবার জন্য সুযোগ নিশ্চিতকরণ: প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের সব পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সন্তানদের নানামুখী প্রতিভা বিকাশের ব্যয়বহুল সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই শহরের অভিজাত এলাকার পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও যেন সমানভাবে শিল্প, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার সুযোগ পায়, সে জন্য সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আগামী শিক্ষাক্রম ও রূপান্তর: এই সংক্রান্ত যাবতীয় পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত বা গুছিয়ে আনা হয়েছে জানিয়ে তিনি ঘোষণা করেন যে, ২০২৭ অথবা ২০২৮ সাল থেকে এই নতুন কার্যক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ ও প্রতিভা অনুযায়ী গান, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা খেলাধুলার নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বিদেশি ভাষা শিক্ষা
বহুভাষায় দক্ষতা অর্জন: ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ কিংবা পেশাগত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিশুদের আন্তর্জাতিক মানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে স্কুল পর্যায় থেকেই অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা শেখানোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
পছন্দ অনুযায়ী ভাষা নির্বাচন: মাতৃভাষা বাংলা এবং আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির পাশাপাশি শিশুরা নিজেদের আগ্রহ ও পছন্দ অনুযায়ী আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান এবং জাপানিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি ভাষাগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটি ভাষা বেছে নিতে পারবে। তৃতীয় কোনো বিদেশি ভাষায় এমন মুন্সিয়ানা ভবিষ্যৎ বিশ্বে অন্য দেশের নাগরিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে শিশুদের যুগোপযোগী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
প্রকৃতিপ্রীতি ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের তাগিদ
সংবেদনশীল মানুষ গড়ার প্রত্যয়: কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, খেলাধুলা বা ভাষাজ্ঞান অর্জন করলেই শিশুদের সার্বিক বিকাশ সম্পন্ন হয় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাদের ভেতরের সুপ্ত মানবিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলার ওপর জোর দেন।
প্রকৃতি ও পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা: শিশুদের উদ্দেশে তিনি বিশেষভাবে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের পাশাপাশি তাদের প্রকৃত অর্থে ভালো ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। এই দেশের সবুজ প্রকৃতি, নদীমাতৃক পরিবেশ এবং অসহায় পশুপাখির প্রতিও যেন তাদের মনে গভীর মায়া, ভালোবাসা ও সংবেদনশীলতা থাকে, সেই শিক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সুবর্ণজয়ন্তীর অন্যান্য আকর্ষণ ও কর্মসূচি
স্মরণিকা উন্মোচন ও প্রদর্শনী: দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে শিশুদের পরিবেশনায় একটি মনোজ্ঞ ও আকর্ষনীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। অনুষ্ঠানে শিশুদের হাতে বিশেষ স্মারক উপহার তুলে দেওয়ার পাশাপাশি শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত ‘শৈশব’ শীর্ষক একটি সুদৃশ্য বিশেষ স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রদর্শনী ও প্রযুক্তিগত উদ্বোধন: এর পরে একাডেমি প্রাঙ্গণে শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত আঁকা ছবি নিয়ে আয়োজিত একটি আকর্ষণীয় চিত্র প্রদর্শনী এবং বিশেষ ফটো গ্যালারি ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে তিনি শিশু জাদুঘর ভবনে গিয়ে এর নিচতলায় নবस्थापित আধুনিক সোলার প্যানেল ও সাব-স্টেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।