চলতি অর্থবছরের শুরুটাতেই বড় ধরনের এক আর্থিক ধাক্কার মুখে পড়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিদ্যুৎ এবং লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) খাতে নির্ধারিত বার্ষিক ভর্তুকির প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থ খরচ হয়ে গেছে। অর্থ বিভাগ ও জ্বালানি সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক ও মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও জ্বালানি খাতের এই লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ভর্তুকি অব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চাপ:
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে এলএনজি ও তরল জ্বালানির মূল্যের অস্থিতিশীলতা এই দ্রুতগতির ব্যয়ের প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ত্রুটি এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হ্রাসের ফলে অতিরিক্ত চড়া দামে এলএনজি আমদানিতে বাধ্য হচ্ছে বর্তমান প্রশাসন। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে স্বাভাবিক নিয়মে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভর্তুকি ব্যয় হওয়ার কথা, সেখানে মাত্র ৯০ দিনের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেক বাজেট শেষ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের বিপাকে পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব:
জাতীয় দৈনিক ও অর্থনৈতিক পোর্টালগুলোর মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে, যেভাবে ভর্তুকির অর্থ নিঃশেষ হচ্ছে, তাতে বছর শেষে এই খাতে নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে দ্বিগুণ বা তারও বেশি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে যদি সরকার জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নেয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে, সরকারের উন্নয়নমূলক বাজেট বা জনকল্যাণমুখী অন্যান্য খাতের বরাদ্দ কাটছাঁট করতে হতে পারে, যা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর করে দিতে পারে।
নীতিনির্ধারক মহলের জরুরি বৈঠক ও কৌশলগত পদক্ষেপ:
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের শীর্ষ কর্তারা ইতিমধ্যে একাধিক জরুরি বৈঠক করেছেন। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সরকার এখন ভর্তুকির লাগাম টেনে ধরতে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে—
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল তরল জ্বালানির (ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল) ব্যবহার কমিয়ে সাশ্রয়ী বিকল্প উৎসের দিকে মনোযোগ দেওয়া।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় বিদ্যমান সিস্টেম লস বা অপচয় কঠোর হাতে দমন করা।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুচারুভাবে জ্বালানি মূল্য সমন্বয় করা, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর হুট করে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ না পড়ে।
সব মিলিয়ে, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক পার হতেই জ্বালানি খাতের এই রেকর্ড পরিমাণ ভর্তুকি ব্যয় দেশের পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংকট উত্তরণে দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণ না করলে আগামী দিনে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে রাষ্ট্র।