ফেনীতে দ্রুত বাড়ছে বহুতলা ভবন। কিন্তু ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড কিংবা বড় কোনো দুর্যোগে এসব ভবনে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই, এমন স্বীকারোক্তিই এসেছে ফায়ার সার্ভিস ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। সরঞ্জাম সংকট, দক্ষ জনবল ঘাটতি এবং জরুরি সমন্বয়ের অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে। এতে উদ্বেগ বাড়ছে নগরবাসীর।
ফেনী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আবদুল হারুন পাশা জানান, “সীমিত যন্ত্রপাতি ও জনবল নিয়ে দুর্যোগকালীন সময়ে আমরা প্রস্তুত থাকি। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো বড় কোনো দুর্যোগে কোনো বহুতলা ভবন ধসে পড়লে আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে যাবে।”
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলা শহরে একটি ও উপজেলা পর্যায়ে পাঁচটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন রয়েছে। মোট ১৩০ জনবল নিয়ে যে কোনো উদ্ধার কাজ সামলাতে হয়। সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে, ১২ তলা সক্ষম একটি ল্যাডার গাড়ি, পাঁচটি পাম্প-টানা গাড়ি, দুটি সড়ক দুর্ঘটনা উদ্ধার ভ্যান, দুটি অ্যাম্বুলেন্স, একটি পাম্প মেশিন এবং একটি স্কাই-লিফট। তবে এই স্কাই-লিফটটি বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের তিন জেলার জন্য যৌথভাবে ব্যবহৃত হয়, যা বড় দুর্ঘটনায় যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সহকারী পরিচালক হারুন পাশা আরও বলেন, “বড় ভবনে উদ্ধার করতে গেলে সময় অনেক বেশি লাগবে এবং ঝুঁকিও তুলনামূলক বাড়বে।”
ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন জানান, “ফেনী পৌর এলাকায় দুই হাজারের মতো ভবন রয়েছে, যার মধ্যে ২-৩ শতাংশ বহুতলা। এগুলো নিয়ম মেনে অনুমোদন নিলেও ভবনভিত্তিক প্রাথমিক উদ্ধার টিম নেই, এটাই বড় সমস্যা।”
তিনি স্বীকার করেন যে, “ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কোনো তালিকা আমাদের কাছে নেই। তবে শিগগিরই তালিকা তৈরির কাজ শুরু হবে।”
ফেনী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম বলেন, “জরুরি সহায়তার জন্য আমরা প্রস্তুত। তবে সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রেসকিউ টিম এবং আন্ত:সংস্থার সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা জরুরি।” তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি, মক ড্রিল এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় জোরদারে জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে।
স্থানীয় নাগরিকরাও বাড়তি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ডাক্তারপাড়ার বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, “বহুতলা ভবন বাড়ছে, কিন্তু উদ্ধার প্রস্তুতি শোচনীয়। বড় কোনো দুর্ঘটনা হলে মানুষ অসহায় হয়ে পড়বে।”
এডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম নান্টু মনে করেন, “ফেনীতে নগরায়ণ দ্রুত এগোচ্ছে, কিন্তু উদ্ধার সক্ষমতা বাড়েনি। এতে সব মিলিয়ে ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন- ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি ও হালনাগাদ, উচ্চক্ষমতার ল্যাডার ও রেসকিউ ক্রেন সংযোজন,হাই-প্রেশার পাম্প বৃদ্ধি, নিয়মিত মক ড্রিল এবং ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের যৌথ জরুরি পরিকল্পনা, নতুন ভবন অনুমোদনে আরও কঠোর নিরাপত্তা যাচাই। দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ একটি জেলা হওয়া সত্ত্বেও উদ্ধার সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।