খন্দকার মোহাম্মাদ আলী,
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
বেলকুচিতে রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে একের পর এক সাংবাদিকদের প্ল্যাটফর্ম। যার যেমন ইচ্ছে, গড়ে তুলছেন “প্রেস ক্লাব” নামের সংগঠন। ক্লাবের ছায়াতলে নিজেদের একাকিত্ব বা পেশাদারিত্বের ঘাটতি ঢেকে সমষ্টিগত শক্তি দেখানোর প্রতিযোগিতা চলছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করা কিছু ব্যক্তি দলীয় ব্যানারের সুযোগ নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা পেশাদারিত্ব বজায় রেখে সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারছে না। মাঠপর্যায়ে সত্য তুলে ধরার পথে নানা বাধা তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অনেকে নেতাদের ইশারায় কাজ করছে।
উপজেলার সরকারি দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা কথিত পেশিশক্তিধারী সাংবাদিকদের রাজনৈতিক মতলবে সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে। প্রবীণ সাংবাদিকেরা শৃঙ্খলা ও নীতি-নৈতিকতার কথা বললেও ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের আচরণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও পেশার মর্যাদাহানি থামছে না। গত এক যুগে আগাছার মতো জন্ম নিয়েছে অসংখ্য নামসর্বস্ব সাংবাদিক এবং তাদের জন্য তৈরি হয়েছে নানান নামের প্রেসক্লাব। ইচ্ছে মতো চলছে এসব সংগঠনের কার্যক্রম। রাজনৈতিক কিছু নেতার হীন উদ্দেশ্যে দলীয় পদ-পদবীধারীরাও সাংবাদিকতার নামে জড়িয়ে পড়ছে, যাতে গণমাধ্যমের শক্তিকে তারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। এতে অপশক্তির উত্থান ঘটছে সাংবাদিকতায়। প্রকৃত সাংবাদিকরা লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে। প্রতিহিংসার বশে নামসর্বস্ব এসব লোকজন রাজনৈতিক নেতাদের মতো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে।
উপজেলা প্রশাসনের সেবামূলক অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে ভিড় জমায় এই কথিত সাংবাদিকরা। যাদের দক্ষতা বা ক্ষমতা তথ্য আইনে নির্ধারিত না হলেও রাজনৈতিক প্রভাবে সীমাহীন ক্ষমতার প্রদর্শন দেখা যায়। এলাকার চিহ্নিত অপরাধীরাও টাকার বিনিময়ে প্রেসকার্ড নিয়ে অবাধ চলাফেরা করছে। সমাজের সচেতন মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। অথচ এখন সেই স্তম্ভে ধরেছে ঘুণ, আর দর্পণেও জমেছে মরিচা—যার ফলে সমাজের সঠিক প্রতিচ্ছবি দেখা যায় না। রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত গণমাধ্যমে এ বাস্তবতা স্পষ্ট।
অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা যেমন রাজনৈতিক প্রবীণদের সরিয়ে দিচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে অপসাংবাদিকতার ধারক-বাহকেরা প্রকৃত সুনামধারী সাংবাদিকদের হটিয়ে দখল নিচ্ছে পেশাদারিত্বের ক্ষেত্র। কিছু অসাধু সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থে এদেরকে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হিসেবে ব্যবহার করছে । বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংসদ নির্বাচনের আগে কিছু ভবঘুরে, বেকার ও দলীয় প্রভাবিত ব্যক্তি নামসর্বস্ব প্রেসক্লাব গড়ে তুলছে। তাদের বেপরোয়া ও অর্থলোভী আচরণে ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা, যা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে। বিভিন্ন পেশার আড়ালে টাকার বিনিময়ে প্রেসকার্ড নিয়ে অনেকে সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে। এর মাঝে রয়েছে মাদক ব্যবসায়ী, জাল টাকার কারবারি, চিহ্নিত অপরাধী, দুষ্কৃতিকারী, সমাজে বিশৃঙ্খলাকারী, অসাধু সরকারি কর্মচারীসহ নানা চরিত্র।
প্রকৃত গণমাধ্যম কর্মীরা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ায় হতবিহ্বল। পেশার ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে।
উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশনের অভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবীদের মাঠতদন্তে দেখা যায়—বেলকুচি, কামারখন্দ, উল্লাপাড়া, কাজিপুর, তাড়াশ, রায়গঞ্জ, চৌহালী, শাহজাদপুর এলাকায় এক যুগ আগে যে সাংবাদিকরা সমাজে শৃঙ্খলা ফেরাতে লেখনী দিয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন, আজ সেই ধারাবাহিকতা বিলীন। তাদের অভিজ্ঞতার আলো জনগণকে সভ্যতার মানদণ্ডে এগিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী।
প্রবীণ গণমাধ্যম কর্মীরা জানান—দুই দশক আগে পত্রিকার সম্পাদকীয় জাতিকে দিকনির্দেশনা দিত। এখন শুধু সম্পাদকীয় নয়, সাধারণ সংবাদের মাঝেও ফুটে ওঠে পক্ষপাত, দলীয় স্বার্থ, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য। ক্ষমতার প্রভাবে ঘটনাকে বিকৃত করে প্রচার করা হয়। এতে পেশা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, জীবনও হুমকির মুখে।
সময় এসেছে আবার জেগে ওঠার। প্রকৃত সাংবাদিকদেরই সুনাম ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হবে। কলমের কালি ও জ্ঞানের শক্তি দিয়েই পৌঁছাতে হবে গন্তব্যে—যেখানে অপেক্ষা করছে গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করা সৈনিকেরা। সমাজের দর্পণ আবার স্বচ্ছ হবে, প্রকৃতি জানবে—শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কলমের কালি অধিক মূল্যবান।