ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন একটি শব্দ আছে, যা ধর্ম, জাতি, ভাষা বা সংস্কৃতি— সব বিভাজনের ঊর্ধ্বে। সেই শব্দটি হলো দয়া। দয়া মানে শুধু করুণা নয়; এটি ভালোবাসা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও মানবিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
মানুষের এই মহৎ গুণের মূল্য স্মরণ করিয়ে দিতে ১৯৯৮ সালে জাপানে প্রথম পালিত হয় বিশ্ব দয়ার দিবস।
এরপর থেকে প্রতি বছর ১৩ নভেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে এই দিবস। এর উদ্দেশ্য— মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া যে“একটি দয়ালু আচরণ, একটি সহানুভূতিশীল মনোভাব— অগণিত জীবনের রূপ বদলে দিতে পারে।
দয়ার দর্শন: মানুষ কেন দয়া করে?
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। একটি শিশু যখন অন্যের কান্নায় কাঁদে, বা কাউকে পড়ে যেতে দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়— তখনই বোঝা যায়, দয়ার বীজ মানুষের জন্মগত।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতা, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও ব্যস্ততার ভিড়ে সেই দয়ার বীজ অনেক সময় শুকিয়ে যায়।
দয়ার মূল দর্শন হলো—“আমি যেমন সুখ চাই, অন্যও তেমন সুখ চায়।”
ইসলামে একে বলা হয় রহমত, বৌদ্ধধর্মে করুণা, খ্রিষ্টধর্মে সহানুভূতি, হিন্দু ধর্মে দয়াধর্ম।
সব ধর্মেই দয়া মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে স্বীকৃত। দয়ার মধ্য দিয়েই সমাজে জন্ম নেয় পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা ও সহযোগিতা।
বিশ্ব দয়ার দিবসের সূচনা
১৯৯৮ সালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে প্রথমবারের মতো ১৩ নভেম্বর “বিশ্ব দয়ার দিবস” পালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল—“দয়া ও সহমর্মিতার চর্চার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলা।” এরপর অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশ এই উদ্যোগে যোগ দেয়।
২০১৯ সালে জাতিসংঘও দিবসটির তাৎপর্যকে স্বীকৃতি দেয়। আজ এটি বিশ্বব্যাপী মানবতার উৎসবে পরিণত হয়েছে।
দয়ার বৈজ্ঞানিক উপকারিতা
বিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে— দয়া কেবল নৈতিক গুণ নয়, এটি মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার অন্যতম চাবিকাঠি।
দয়া করলে মস্তিষ্কে “সুখ হরমোন” নিঃসৃত হয়, যা মনকে প্রশান্ত রাখে।
নিয়মিত দয়া চর্চা করলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কমে যায়।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, ঘুম ভালো হয়, এমনকি আয়ুও বাড়ে।
সমাজে দয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে জন্ম নেয় পারস্পরিক আস্থা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা। অর্থাৎ, দয়া যেমন অন্যের কল্যাণে, তেমনি নিজের মন ও শরীরেরও ওষুধ।
আধুনিক সমাজে দয়ার প্রয়োজন
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানবিকতায় যেন পিছিয়ে পড়ছে। মানুষ ব্যস্ত নিজের স্বার্থে, আত্মকেন্দ্রিকতায়। এমন বাস্তবতায় দয়া এখন এক সামাজিক আন্দোলন। একটি ছোট কাজ— রিকশাচালককে এক গ্লাস পানি দেওয়া, কোনো অসহায়কে সাহায্য করা, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো— এইসব ছোট ছোট দয়া সমাজে বড় পরিবর্তন আনে। দয়া হলো এমন এক শক্তি, যা শব্দ ছাড়াই মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ
ইসলাম:-কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন—“তুমি দয়ালু হও যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করেছেন।” (সূরা কাসাস: ৭৭) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—“যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।” (সহিহ মুসলিম)
খ্রিষ্টধর্ম:-যিশুখ্রিষ্ট বলেছেন—“তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো।”
বৌদ্ধধর্ম:- গৌতম বুদ্ধ বলেছেন—“একটি দয়ার কথা তিন শীতেও উষ্ণতা দেয়।”
হিন্দুধর্ম:- উপনিষদে বলা হয়েছে—“দয়া পরম ধর্ম।” অতএব, ধর্মভেদে বার্তা একটাই— দয়া মানবতার শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
দয়ার অভাবের পরিণতি
যেখানে দয়া নেই, সেখানে জন্ম নেয় হিংসা, বৈরিতা, অবিচার ও একাকিত্ব। আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, বৈষম্য, দুর্নীতি— এসবের মূল কারণ মানবিকতার অভাব। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, উন্নয়ন— সবই অর্থহীন যদি দয়ার আলোকশিখা নিভে যায়।
তাই বিশ্ব দয়ার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—“দয়া ফিরিয়ে আনো, মানুষকে মানুষের মতো ভালোবাসো।”
দয়া চর্চার সহজ উপায়
দয়া মানে বড় কিছু নয়; ছোট ছোট কাজেই লুকিয়ে আছে বড় পরিবর্তন। যেমন—
১. কারও প্রতি হাসি উপহার দেওয়া।
২. অসহায় মানুষকে সাহায্য করা।
৩. বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষের খোঁজ নেওয়া।
৪. পরিবেশ ও প্রাণীর প্রতি যত্নশীল থাকা।
৫. অন্যের ভুল ক্ষমা করা।
৬. কাউকে নিরুৎসাহ না করে উৎসাহ দেওয়া। এই সামান্য কাজগুলোই সমাজে শান্তির বার্তা ছড়ায়।
শিক্ষায় দয়ার পাঠ
* শিশুরা যেন ছোট থেকেই দয়া ও সহমর্মিতা শিখে— সেটি অত্যন্ত জরুরি।
* স্কুলে যদি নিয়মিতভাবে “মানবিক মূল্যবোধ” ও “সহানুভূতির শিক্ষা” দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে দায়িত্ববান ও নৈতিক।
* শিক্ষক ও অভিভাবক নিজেরা যদি দয়ার উদাহরণ দেন, শিশুরা তা সহজে গ্রহণ করে।
কর্মক্ষেত্রে দয়া
একটি কর্মক্ষেত্রে দয়া বা সহমর্মিতা থাকলে কাজের পরিবেশ হয়ে ওঠে ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক।
যে নেতৃত্ব কর্মীদের কষ্ট বোঝে, ভুলে নয় বরং শেখার সুযোগ দেয়— সেই নেতৃত্বই প্রকৃত মানবিক নেতৃত্ব।
দয়ার সংস্কৃতি শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, গোটা সমাজকে স্থিতিশীল করে।
বাংলাদেশে মানবিকতার এক দৃষ্টান্ত:
বাংলাদেশে দয়া ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অসুস্থ, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে থেকে প্রকৃত অর্থে দয়ার কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।
তাদের মূল লক্ষ্য—“প্রত্যেক মানুষ যেন চিকিৎসা ও সহানুভূতির অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।”
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এই সংগঠনের সদস্যরা কাজ করছেন। তারা নিয়মিতভাবে আয়োজন করছে বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির, ওষুধ বিতরণ কর্মসূচি, শীতবস্ত্র ও খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম, স্বাস্থ্য সচেতনতা সভা এবং অসহায় রোগীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে তাদের কার্যক্রম ছিল অনন্য— অক্সিজেন সরবরাহ, রক্ত সরবরাহ ও খাদ্য বিতরণের মাধ্যমে তারা অসংখ্য জীবন বাঁচিয়েছে। তারা শুধু শহরে নয়, গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ, কৃষক, শ্রমজীবী, পথশিশু ও প্রবীণদের কাছেও পৌঁছে দিয়েছে মানবতার সেবা।
জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি প্রমাণ করেছে— দয়া মানে করুণা নয়; এটি কর্ম, দায়িত্ব ও ভালোবাসার সমন্বয়। তাদের প্রতিটি উদ্যোগ সমাজে মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে, যেখানে মানুষ আবার মানুষকে ভালোবাসতে শিখছে।
পরিশেষে বলতে চাই, দয়া শুধু একটি অনুভূতি নয়, এটি মানুষের অস্তিত্বের সারাংশ।যেখানে দয়া আছে, সেখানে থাকে ভালোবাসা, শান্তি ও নিরাপত্তা। একটি সহানুভূতিশীল মন সমাজে এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যা শক্তি বা অর্থ কখনো পারে না। আজকের পৃথিবীতে দয়ার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
যুদ্ধ, বৈষম্য, আত্মকেন্দ্রিকতা ও লোভের এই যুগে দয়ার অনুপস্থিতি মানুষকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে একে অপরের কাছ থেকে। তাই প্রয়োজন— হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়া, একে অপরের কষ্টে সাড়া দেওয়া এবং সমাজে মানবতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। দয়া মানে কেবল দান নয়; এটি সম্মান, মমতা ও অন্যের সুখ-দুঃখে অংশ নেওয়ার অঙ্গীকার।
যখন আমরা নিজেদের মধ্যে দয়া চর্চা করি, তখন পৃথিবী একটু করে বদলে যায়— কোনো ক্ষুধার্তের মুখে হাসি আসে, কোনো অসহায়ের মনে জন্ম নেয় আশার আলো। সত্যিই, পৃথিবীকে সুন্দর করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—একটু দয়া, একটু সহানুভূতি আর সামান্য ভালোবাসা।
লেখক, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
এ জাতীয় আরো খবর..