অর্থনীতি ডেস্ক:
দেশের আর্থিক, জ্বালানি ও রাজস্ব খাতে জরুরি এবং গভীর সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির মন্থর গতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে আটকে থাকতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ ও বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ
প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী পূর্বাভাস: বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৩ সাল থেকে দেশের অর্থনীতিতে ধীরগতি চলছে। চলতি অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা থেকে উত্তরণে কাঠামোগত পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।
ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে, যা আগের বছরের ডিসেম্বরে ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। এই আর্থিক দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা: দেশের রাজস্ব আয় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। রাজস্ব আদায়ে এই ঘাটতির কারণে সরকারের উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক ব্যয় সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যাহত: গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকায় শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা সার্বিক ব্যবসায়িক খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক এই শ্লথগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে এবং নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জরুরি সংস্কারের সুপারিশ
অর্থনীতিকে টেকসই ও গতিশীল করতে বিশ্বব্যাংক কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে:
১. আর্থিক খাত পুনর্গঠন: ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা।
২. জ্বালানিনিরাপত্তা ও সুশাসন: শিল্প খাতের উৎপাদন সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
৩. অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি: করকাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, যাতে জনকল্যাণমূলক খাতে সরকারি বিনিয়োগের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
৪. লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা: সাধারণ ভর্তুকির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য নগদ সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি আরও কার্যকর করা।
এ জাতীয় আরো খবর..