নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে বুধবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ঢাকায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক ‘উচ্চাভিলাষী’ নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন।
ইশতেহারের মূল প্রতিশ্রুতি—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) চার গুণ বাড়িয়ে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি করবে জামায়াত।
রাজনীতিক ও কূটনীতিকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ৬৭ বছর বয়সি শফিকুর রহমান বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং জনকল্যাণমূলক খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করারও অঙ্গীকার করেন তিনি।
তবে ঢাকার অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ইশতেহারে অর্থায়নের বাস্তব দিক নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তাদের মতে, এতে স্লোগান বেশি, বিস্তারিত পরিকল্পনা কম।
যদিও বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের জন্য এই ইশতেহারের মূল উদ্দেশ্য হিসাব-নিকাশ নয়, বরং ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক অভিপ্রায় তুলে ধরা।
রাজনৈতিক শূন্যতায় জামায়াতের উত্থান
দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতকে কট্টর ধর্মভিত্তিক দল হিসেবেই জেনে এসেছে মানুষ। কিন্তু নতুন ইশতেহার জামায়াতকে একটি আধুনিক, শাসনযোগ্য বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে—যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে, দর্শক-শ্রোতাদের উপস্থিতিতেও। একসময় ব্যবসায়ী ও বিদেশি কূটনীতিকরা জামায়াত থেকে দূরে থাকলেও এখন তারা প্রকাশ্যেই দলটির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ইউরোপ, পশ্চিমা দেশ এমনকি ভারতের কূটনীতিকরাও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ কার্যত রাজনীতির বাইরে চলে গেলে এবং বিএনপি একমাত্র বড় দল হিসেবে থাকায়, অনেকেই ভেবেছিলেন ছাত্রনেতৃত্বাধীন নতুন দল সেই শূন্যতা পূরণ করবে। কিন্তু বাস্তবে জামায়াতই সেই জায়গা দখল করতে শুরু করে।
নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে জামায়াত এখন বিএনপির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিছু জরিপে দলটি দেশের শীর্ষ দুই রাজনৈতিক শক্তির একটি হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে যে নেতার দল দু’বার নিষিদ্ধ হয়েছে, তার জন্য আসন্ন নির্বাচন এমন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে, যা এক বছর আগেও কেউ কল্পনা করার সাহস পেত না: শফিকুর রহমান কি তবে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন?
শফিকুর রহমান: নেতা ও প্রতীক
জামায়াত এবং এর নেতাকে নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে বড় কারণ হলো বাংলাদেশে তৈরি হওয়া একটি রাজনৈতিক শূন্যতা।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান শুধু শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসানই ঘটায়নি; এটি দেশের পুরো রাজনৈতিক কাঠামোকেই ওলটপালট করে দেয়। বহু দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি যে দুই দলের দ্বন্দ্বে আবর্তিত ছিল—শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—সেই পরিচিত দ্বৈত কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে।
আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠ থেকে প্রায় পুরোপুরি বাদ পড়ে গেলে এবং বিএনপি একমাত্র বড় দল হিসেবে টিকে থাকায় সেখানে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন, ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সেই শূন্যতা পূরণ করবে। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থাকা জামায়াতই সেই জায়গা দখল করতে এগিয়ে আসে।