-এম নজরুল ইসলাম খান
শিখন দক্ষতা যাচাই মানসম্মত শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ করে।মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া গুণগত শিক্ষা সম্ভব নয়। আর গুণগত শিক্ষা ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা প্রাণহীন বা মৃত শিক্ষা।অন্যদিকে টেকসই শিক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে জাতিসংঘ সহ উন্নয়ন সংস্থাগুলি কাজ করছে।জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য সমূহের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষা বিষয়টি ৪ নাম্বারে আছে। সবার জন্য বর্ণ- ধর্ম-অর্থ- স্ট্যাটাস নির্বিশেষে মানসম্মত,সাম্য ভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জীবনব্যাপী শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা টেকসই শিক্ষার আসল কথা।টেকসই শিক্ষা ছাড়া গুণগত শিক্ষা- মানসম্মত শিক্ষা অর্থহীন।আর এ সকল শিক্ষার মূল বিষয়টি শিখন দক্ষতা মূল্যায়নের উপর নির্ভরশীল। শিখন দক্ষতা মূল্যায়ন সঠিকভাবে না হলে মানসম্মত, গুণগত, টেকসই শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সফলতা নির্ধারিত হয় শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী শিখছে এবং সেই শিখন কতটা কার্যকরভাবে তাদের জীবন ও সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে তার মাধ্যমে। এই বাস্তবতায় শিখন দক্ষতা মূল্যায়ন আজ কেবল একটি শিক্ষাগত কার্যক্রম নয়; বরং মানসম্মত, গুণগত ও টেকসই শিক্ষা নিশ্চিত করার একটি মৌলিক পূর্বশর্ত।
একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্য বই পড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নন তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা,কৌতূহল,আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। হ্যাঁ,শিখন মূল্যায়ন বা শিখন যাচাইয়ে সব সময় শিক্ষক কার্যকর ভূমিকা পালন করতে এককালীন কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত ধারাবাহিক,বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন দায়িত্বশীল তদারকি ও ইতিবাচক প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ধরে রাখার উদ্যোগ জোরদার করা জরুরী।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পেলেও শিখনের মান নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বহু শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী প্রত্যাশিত পড়া, লেখা ও গণিত দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে পরবর্তী স্তরে গিয়ে তারা শেখার চাপ সামলাতে পারে না এবং একসময় শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এই শিখন ঘাটতি শনাক্ত না করে কেবল পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করাকে সাফল্য ধরে নেওয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করে।
শিখন দক্ষতা মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে শ্রেণিবদ্ধ বা শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তার শেখার অবস্থা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। নিয়মিত ও বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকের পাঠদান পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব হয় এবং শিক্ষার্থীভেদে ভিন্ন কৌশল গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে এটি শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে নির্ধারিত পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, উপযুক্ত অবকাঠামো ও কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবে এসব কাঠামোর ভেতরে গুণগত শিক্ষা তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধান ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও মূল্যবোধ বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিখন দক্ষতা মূল্যায়ন এই গুণগত দিকগুলোকে দৃশ্যমান করে তোলে।
একই সঙ্গে টেকসই শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিখন মূল্যায়নকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে ঝরে পড়া রোধ, শিখন বৈষম্য হ্রাস এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এটি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় শিখন দক্ষতা মূল্যায়নকে গবেষণাভিত্তিক, ধারাবাহিক ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে যদি এই মূল্যায়ন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়,তবে তা মানসম্মত কাঠামোর ভেতরে গুণগত শিক্ষা সৃষ্টি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করবে।
শিখন দক্ষতা মূল্যায়ন তাই কোনো অতিরিক্ত উদ্যোগ নয়—এটি শিক্ষার গুণগত রূপান্তরের অপরিহার্য শর্ত। শিখন দক্ষতা যাচাই সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা কেবল শিক্ষার মান উন্নয়নই নয় বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি দক্ষ,মানবিক ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ।
এ জাতীয় আরো খবর..