ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
আজ শুক্রবার। প্রতিবছর ১২ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস ২০২৫। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২/১৩৮ রেজোলিউশনের মাধ্যমে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের প্রতিটি মানুষ যেন আর্থিক সীমাবদ্ধতা বা সামাজিক বৈষম্যের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়। স্বাস্থ্য কোনো দয়া নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা, রোগীর অধিকার এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে অগ্রগতি করছে।
স্বাস্থ্য অধিকার: মানুষের মৌলিক দাবি
স্বাস্থ্য অধিকার শুধুমাত্র হাসপাতাল বা ওষুধ পাওয়ার বিষয় নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যেখানে সুপেয় পানি, নিরাপদ খাদ্য, পুষ্টি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং চিকিৎসা সেবা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যবান্ধব নীতি ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর হয় না। তাই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাস্থ্য কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং মানুষের মৌলিক অধিকার।
বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশগুলোতে উন্নত চিকিৎসা, জরুরি সেবা ও প্রযুক্তি সহজলভ্য, কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসা ব্যয়, ডাক্তার সংকট এবং অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। অসংখ্য পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যের চক্রে ফেঁসে যাচ্ছে। এই বৈষম্য কমানোই সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি করেছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও সহজলভ্য চিকিৎসা পাচ্ছে।
তবুও চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ছে, দক্ষ জনবল কম, গ্রামে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব প্রকট। স্বাস্থ্য বীমা সীমিত, বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যয় অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণে ঘাটতি থাকায় স্বাস্থ্যসেবার সর্বজনীনতা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা: শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাই টেকসই হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ গ্রামে বসবাস করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে প্রয়োজন: প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও নার্স, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ, মা ও শিশুবান্ধব সেবা, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম এবং টেলিমেডিসিনের সহজলভ্যতা। যদি এসব নিশ্চিত হয়, গ্রামীণ জনগণ স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা পাবে, শহরের ওপর চাপ কমবে এবং চিকিৎসার ব্যয় হ্রাস পাবে।
স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি
বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং নদীভাঙনের পর পানিবাহিত ও খাদ্যবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কোভিড-১৯ মহামারি দেখিয়েছে—দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক কাঠামোকে অচল করে দিতে পারে। তাই জরুরি মেডিকেল টিম, মোবাইল ক্লিনিক, দ্রুত ওষুধ বিতরণ এবং স্থায়ী স্বাস্থ্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতকে ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তি: নতুন সম্ভাবনা
ডিজিটাল প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবার নতুন দিগন্ত খুলেছে। টেলিমেডিসিন গ্রামে দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দিচ্ছে, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড সেবা ব্যবস্থাকে দক্ষ ও স্বচ্ছ করছে, মোবাইলভিত্তিক স্বাস্থ্য বার্তা জনগণকে সচেতন করছে এবং ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগ ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব। প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করতে পারে।
নারীর স্বাস্থ্য: সমাজ ও পরিবার উন্নয়নের মূল
নারীর স্বাস্থ্য উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশের মানবসম্পদ পূর্ণ হয় না। মাতৃস্বাস্থ্য, কিশোরীর পুষ্টি, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা—এগুলো নিশ্চিত না হলে স্বাস্থ্য অধিকার অসম্পূর্ণ থাকে। স্বাস্থ্যবান মা-ই স্বাস্থ্যবান প্রজন্মের ভিত্তি স্থাপন করে।
শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্য: দেশের উৎপাদনশীল শক্তি
কারখানা, নির্মাণ ও পরিবহন খাতের শ্রমিকরা দেশের উৎপাদনশীল শক্তি। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ, অপর্যাপ্ত সুরক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধার অভাবে তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। নিরাপদ কর্মস্থল, প্রাথমিক চিকিৎসা, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং স্বাস্থ্যবান্ধব নীতি তাদের উৎপাদনশীলতা ও দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব: স্বাস্থ্য মানে উৎপাদনশীলতা
একটি দেশের স্বাস্থ্য খাত যত শক্তিশালী, তার উৎপাদনশীলতা তত বেশি। অসুস্থতা বাড়লে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়, কর্মক্ষমতা কমে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাস্থ্য উন্নত হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। স্বাস্থ্য বিনিয়োগই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মূল চালিকা শক্তি।
জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির ভূমিকা
২০২০ সাল থেকে রোগীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি তারা চিকিৎসা সচেতনতা বৃদ্ধি করছে,মানবিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করছে,প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে সহজলভ্যতা বাড়াচ্ছে,স্বাস্থ্য বিষয়ে জনগণকে নিয়মিত সচেতন করছে।এই উদ্যোগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সমতাভিত্তিক, মানবিক এবং টেকসই করতে সহায়তা করছে।সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
স্বাস্থ্যসেবা যত উন্নত হোক, যদি জনগণ স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন না হয়, সুফল অর্জন সম্ভব নয়। পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত টিকাদান এবং রোগ সংক্রান্ত তথ্য জানা জরুরি। পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা নাগরিকদের স্বাস্থ্য সচেতন করে তোলে।
পরিশেষে বলতে চাই, আন্তর্জাতিক সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন, সমতা, মানবিকতা বা জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে; তবুও স্বাস্থ্যসেবার সাম্য, প্রাপ্যতা এবং মান নিশ্চিত করার জন্য আরও কর্মপ্রয়াস প্রয়োজন। রোগীর অধিকার, সচেতনতা এবং মানবিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য মাঠপর্যায়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি। অঙ্গীকার হোক—কেউ চিকিৎসার অভাবে পিছিয়ে থাকবে না, কেউ অসুস্থতার কারণে দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়বে না। সবার জন্য নিরাপদ, সহজলভ্য এবং মর্যাদাপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হলো সমৃদ্ধ, মানবিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রধান শর্ত।
লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
এ জাতীয় আরো খবর..