×
সদ্য প্রাপ্ত:
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে ধানক্ষেত এর পাশ থেকে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার মোন্থা’ এখন প্রবল ঘূর্ণিঝড়, বেড়েছে বাতাসের গতিবেগ না ফেরার দেশে তিনবারের বিশ্বজয়ী হাফেজ ত্বকী অস্ত্র মামলায় সম্রাটের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ পরিশোধের দাবি সিলেটে দুই ট্রাক সাদাপাথর জব্দ, চালকদের দেড় লাখ টাকা জরিমানা হবিগঞ্জে জামায়াত প্রার্থীর গাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলা ঢাকার ফ্লাইট নামছে চট্টগ্রাম-কলকাতায় মক্কায় এক সপ্তাহে ১৩.৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ দুটি পবিত্র মসজিদ পরিদর্শন করেছেন শিক্ষকদের ‘মার্চ টু সচিবালয়’ শুরু, পুলিশের বাধা
  • প্রকাশিত : ২০২৫-১২-০৬
  • ১২৪ বার পঠিত
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশনের পেশা নয়—এটি সত্য অনুসন্ধান, অন্যায় উদ্ঘাটন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার এক অনন্য সামাজিক দায়িত্ব। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সাংবাদিকতা রাষ্ট্রক্ষমতার জটিলতা, সামাজিক বৈষম্য ও শৃঙ্খলাহীনতা তুলে ধরে সমাজকে সচল রাখে। কিন্তু যে পেশা সমাজকে আলোকিত রাখে, সেই পেশার যোদ্ধারাই আজ নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় সংকটে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ দিনদিন আরও প্রতিকূল হয়ে উঠছে। নির্যাতন, হামলা, মামলা, হয়রানি, ভয়ভীতি—অসংখ্য ঝুঁকির সাথে লড়াই করেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এসব হামলা ও নির্যাতনের অধিকাংশই বিচারহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে যায়; অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, আর সাংবাদিকেরা হয়ে পড়েন আরও অসহায়।

সাংবাদিক নির্যাতনের বহুমাত্রিক রূপ

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন শুধু শারীরিক নয়; মানসিক, পেশাগত এবং আইনি জটিলতাও এর অংশ।

১. শারীরিক আক্রমণ ও প্রাণনাশের হুমকি

মাঠপর্যায়ে রিপোর্টিং করতে গিয়ে মারধর, অপহরণ, অস্ত্রের মুখে জিম্মি হওয়া এবং সর্বোপরি হত্যাকাণ্ড—এতকিছুর মধ্যেই সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়।

২. মানসিক চাপ ও সামাজিক অপমান

হুমকিমূলক কল, গোপন নজরদারি, চরিত্রহননের চেষ্টা—এসবই সাংবাদিকদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে।

৩. আইনি হয়রানি ও মামলা

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনের অপব্যবহার করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের পেশাজীবনকেই অচল করে দেয়।

৪. পেশাগত চাপ ও চাকরিচ্যুতি

প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপের মুখে সাংবাদিকদের চাকরি হারানো বা পেশা ছাড়তে বাধ্য করা—দেশে এখন নিয়মিত ঘটনার মতো।

বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ভয়াবহ বাস্তবতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদন্ত, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যা: নৃশংসতার চরম দৃষ্টান্ত

২০২৫ সালের ৭ আগস্ট গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় শত মানুষের সামনে সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়; বরং সমগ্র সাংবাদিক সমাজের ওপর নিক্ষিপ্ত এক ভয়াবহ বার্তা—সত্য বললেই মৃত্যু।

তুহিন স্থানীয় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অপকর্ম প্রকাশ করেছিলেন। তার ফেসবুক লাইভগুলোই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন অপরাধীর বিচার কোথায় গিয়ে থামবে—সাংবাদিক সমাজ এ নিয়ে আজও শঙ্কিত। কারণ অতীত বারবার প্রমাণ করেছে, এমন ঘটনার বিচার প্রায়ই অন্ধকারেই হারিয়ে যায়।

ফরিদুল মোস্তফা খানের ওপর নির্যাতন: রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নির্মম প্রতিচ্ছবি

২০১৯ সালে কক্সবাজারের সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানের ওপর উন্মুক্ত রাষ্ট্রীয় নির্মমতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় তা আজও ক্ষত হয়ে আছে সাংবাদিক সমাজে। তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাসের দুর্নীতি ও মাদক সিন্ডিকেটের চিত্র প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি চরম নির্যাতনের শিকার হন।

ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে কক্সবাজারে নেওয়া হয়; দিনের পর দিন অকথ্য নির্যাতন, ৬টি সাজানো মামলা, ১১ মাস কারাভোগ, আজও অসমাপ্ত তদন্ত—সব মিলিয়ে ফরিদুলের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। পাসপোর্ট নবায়ন পর্যন্ত আটকে দেওয়া হয়েছে ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ না দেওয়ার অজুহাতে, যা মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।

এ এক ব্যক্তিবিশেষ নয়; রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহারের ভয়াবহ অপব্যবহারের প্রতিচ্ছবি।

সাগর-রুনি হত্যা: বিচারহীনতার চিরস্থায়ী স্মারক

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তদন্তের মেয়াদ ৮৫ বারের বেশি পিছিয়েছে। গত তেরো বছরে বিচার তো দূরে থাক, ঘটনার রহস্যও উদ্ঘাটিত হয়নি। এই বিচারহীনতা সাংবাদিকদের মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই মামলার বিচার না হওয়া আজকের বারবার ঘটা সাংবাদিক নির্যাতনের অন্যতম বড় প্রেক্ষাপট। বার্তাটি পরিষ্কার—সাংবাদিক হত্যা করলেও শাস্তি নিশ্চিত নয়।

সাংবাদিক নির্যাতনের মূল কারণ

১. রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য
২. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপব্যবহার ও পক্ষপাতমূলক তদন্ত
৩. বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা
৪. দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক কাঠামো
৫. গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দুর্বল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ

১. স্বাধীন ও শক্তিশালী আইন প্রণয়ন

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইন ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।

২. নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত কমিটি

সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত কাঠামো গঠন করতে হবে।

৩. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনের সংস্কার প্রয়োজন।

৪. পেশাগত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ

মাঠপর্যায়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষায় সাংবাদিকদের দক্ষতা জরুরি।

৫. আন্তর্জাতিক সংস্থার নজরদারি বৃদ্ধি

মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

৬. গণমাধ্যম মালিকদের দায়িত্বশীল অবস্থান

নিজস্ব সাংবাদিকদের আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ

সত্য প্রকাশে সাংবাদিকের পাশে জনগণ দাঁড়ালে অপরাধীরা সাহস হারাবে।

পরিশেষে বলতে চাই,সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়—এটি রাষ্ট্রের বিবেক। যখন এই বিবেককে স্তব্ধ করা হয়, তখন সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। গাজীপুরে তুহিন হত্যাকাণ্ড, ফরিদুল মোস্তফার ওপর নির্যাতন কিংবা সাগর-রুনি হত্যার বিচারহীনতা—প্রতিটি ঘটনা প্রমাণ করে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ আজ ভয়াবহ সংকটে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো গণতন্ত্র টেকসই হয় না। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, জনগণের অধিকার ও সমাজের ন্যায়বিচারকে সুরক্ষিত রাখা।

সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেলে অন্যায় আরও পুষ্ট হয়। একটি আলোকিত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে সাংবাদিকদের সুরক্ষা আজ আর শুধু প্রয়োজন নয়—এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক, সংগঠক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
lube
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat