সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার চট্টগ্রাম মহানগর প্রতিনিধি ঃ
মানুষ এবং অন্য সব প্রাণীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কি ?শারীর গঠন বা জিনোমকোডে বা শরীরে উপাদানগত পার্থক্য তেমন নেই বললেই চলে। শারীরিকভাবে মানুষ যেভাবে গঠিত, যে উপাদানে গঠিত, যে পদ্ধতিতে গঠিত পৃথিবীর সকল প্রাণী এমনকি উদ্ভিদ একই। জেনেটিক তেমন বড় কোন পার্থক্য নেই।DNA- RNA -ডাবল হেলিক্স, ক্রোমোজোম,জিনোম কাঠামোতে পার্থক্যগুলি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, শারীরিকভাবে অন্য সকল প্রাণী এমনকি উদ্ভিদের সাথে মানুষের পার্থক্য খুবই সামান্য।তাছাড়া ক্ষুধা,তৃষ্ণা, ঘুম,মৌথুন এসবের চাহিদাতে অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের কোন পার্থক্যই নেই।
সভ্যতার যাত্রাপথে মানুষ কেবল শরীরের মানুষ নয়—মানুষ সেতো চেতনার মানুষ। মানুষের প্রকৃত পরিচয় বাহ্যিক রীতি-নীতি, পোশাক, আচারের বহর কিংবা আড়ম্বর নয়; বরং তার অন্তরের মানবিকতা, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে দেখা যাচ্ছে এক অদৃশ্য সংকট—মানুষ তার আচারের দীপ্তিতে যত উজ্জ্বল হচ্ছে, মানবিকতার আলো ততই নিভে যাচ্ছে। বাহ্যিক ধর্মীয়তা, সামাজিক রীতি, অনুশাসনের আবরণ যত ঘন হচ্ছে, মনুষ্যত্ব ততই লুপ্তপ্রায়।
এই অবক্ষয় শুধু ব্যক্তি জীবনের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং জাতির ভবিষ্যতেরও গভীর সংকেত।
মনুষ্যত্ব,দয়া,সততা,ন্যায়পরায়ণতা,অন্যকে সাহায্য করা,অন্যের অধিকারকে সম্মান, মনুষ্যত্ব এসব অদৃশ্য। তাই মানুষ প্রায়ই দৃশ্যমান রীতি-নীতিকেই গুরুত্ব দেয়, অথচ অদৃশ্য মানবিকতা অবহেলিত থাকে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়,পৃথিবীর সকল ধর্ম গ্রন্থে যে সকল মানুষের প্রত্যাশা করছে সে সকল মানুষ বাস্তব জগ প্রত্যক্ষ হচ্ছে না। যেমন, মুসলমানদের মহাগ্রন্থ আল কুরআনে যে সকল প্রত্যাশিত মানুষের চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে বা মানুষের চরিত্রের যে বর্ণনা এসেছে বাস্তব জগতে সে মানুষ বিরল।আল-কোরআনে ১০৪ নং সুরার 'হুমাজায়'- সূরায় যে সকল মানুষের প্রত্যাশা করা হয়েছে তা বাস্তবে কোথায়? ১০৩ নাম্বার সূরা তে ' আল আসর'এর মধ্যে যে মানুষের বর্ণনা আছে, আমাদের সমাজে যে রকমের মানুষ তৈরির জন্য এই সূরাটতে তাগিদ করেছে সমাজে সে মানুষ পাওয়া কঠিন। ১০২ নং সূরা 'আত তাকাছুর' এর অর্থ হচ্ছে 'প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা' মানুষের মধ্যে প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় মানবতা-মনুষ্যত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। ৮৩ নং সূরা নাম 'মুতাফ্ফিফিন' এর অর্থ হচ্ছে 'ধোকাবাজ'/ বাটপার' এই ধরনের মানুষ থেকে মনুষ্যত্বকে বাঁচাতে পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে কিন্তু বাস্তবে কি তা আমরা পাচ্ছি?আমাদের মাঝে যে সমস্ত ব্যবসায়ী ব্যবসা-বাণিজ্য লেনদেন করেন তার ভিতরে কতজন আসল-প্রকৃত ব্যবসায়ী! ৬৩ নাম্বার সূরা 'মুনাফিকুন' মুনাফিকুন এর ভিতর যে বর্ণনা আছে সে অনুযায়ী কতজন প্রকৃত মুসলিম!?এভাবে পবিত্র কোরআন থেকে বর্ণনা অনুসারে যে মানুষ পাওয়ার কথা তা বাস্তবে কোথায়?
মানবিকতা সব ধর্মের হৃদয়।
বিশ্বের সব ধর্মের মূল নির্দেশ একই—
মানুষ হও, ন্যায়বান হও, দয়া প্রদর্শন করো।
আচারের উদ্দেশ্যই ছিল—মানুষকে এসব গুণে আলোকিত করা।
“ধার্মিকতা দাড়ি-টুপিতে নয়; ধার্মিকতা ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা, ধৈর্য ও সত্যবাদিতায়।”
নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—
“সর্বোত্তম মানুষ সে–যে মানুষের উপকার করে।”
উপনিষদে বলা হয়েছে—
“অহিংসা পরম ধর্ম”—দয়া ও করুণাই সর্বোচ্চ আচার।
ভগবদ্গীতা বলে—
“ধর্ম হলো যা লোককল্যাণ সাধন করে।”
গৌতম বুদ্ধ শিক্ষা দিয়েছেন—“কর্মই ধর্ম; মানুষের মনুষ্যত্বই মুক্তির পথ।”
যিশু খ্রিস্ট বারবার ঘোষণা করেছেন—
“তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো।”
কোনো ধর্মই বাহ্যিক আচারের পূজা চায়নি—সব ধর্মই মানুষের আত্মাকে মানবিকতার দিকে জাগ্রত করতে চেয়েছে।
সমাজে কেন বাহ্যিক আচারের বিস্তার, মানবিকতার অবক্ষয়?
বাহ্যিক আচার সহজ—অভ্যাসে পরিণত হয়
মানুষ বাহ্যিক আচারে যত সহজ, মানবিকতার দায়িত্ব তত কঠিন। দয়া, সততা, ন্যায়পরায়ণতা—এসব অন্তরের সাধনা।
অনেক সময় বাহ্যিক ধর্মীয়তা, আচার, রীতি, পোশাক—এগুলোতেই মানুষ সামাজিক সম্মান পায়।
ফলে দেখা যায়—“চেহারায় ধার্মিক, কাজে নিষ্ঠুর।”
স্কুলে পাঠ্যসূচি আছে, কিন্তু মানুষ হওয়ার পাঠ নেই।
বলা হয় কীভাবে প্রার্থনা করবে, কিন্তু খুব কমই বলা হয়—“মানুষকে কীভাবে ভালোবাসবে।”
মানুষের অভ্যন্তরীণ মানবিকতা কিভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে?
মানুষ পেতে হলে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে পাওয়া যায় ।শুধু বই বা কিতাব মুখস্ত করার মধ্যে নয়।—সততা,দয়া,সহমর্মিতা,মানবাধিকারের সম্মান
এসবকে পাঠ্যসূচিতে যুক্ত করতে হবে।
সম্মানিত ধর্ম প্রচারকদের উচিত—
রীতিতে নয়, মানবিকতায় জোর দেওয়া।রীতি-আচার এগুলি অবশ্যই দরকার কিন্তু রীতি-আচারই প্রকৃত ধর্ম নয়।
“মানুষ হও”—এই শিক্ষা পরিবারে না থাকলে অন্য কোথাও জন্ম নেয় না।
আচারের শৃঙ্খলা ভালো—
কিন্তু তা যেন মানবিকতাকে ঢেকে না ফেলে।
প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—
“আজ আমি মানুষের জন্য কী উপকার করলাম?”
এটাই মনুষ্যত্বের জাগরণ।
মনুষ্যত্বের অবক্ষয় কোনো ধর্মের ব্যর্থতা নয়—এটি ব্যবহারকারীর ব্যর্থতা।
ধর্ম মানুষকে সেই উচ্চতায় পৌঁছানোর পথ দেখায়, আচার সেই পথের অনুশাসন মাত্র।
কিন্তু লক্ষ্য ভুলে গেলে আচারই ধর্ম হয়ে যায়, আর মানুষের হৃদয় শূন্য হয়ে পড়ে।ধর্মের মূল কথা থেকে বিচ্যুত হয়ে শুধু ধার্মিক বসে থাকলেই ধর্ম পালন হয় না।
“আচার নয়, মানবিকতা—এটাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।পোশাক-পরিচ্ছদ চেহারা-সুরত যেরকমই থাকুক তার সাথে ধর্মের মূল জিনিসটা না হারিয়ে ধার্মিকতা, মানবিকতা, মনুষত্ববোধ জাগ্রত করে আল্লাহর হক তথা সৃষ্টিকর্তার হক এবং মানুষের অধিকার প্রদান করা উত্তম ।আবরণে নয় আচরণেই মনুষত্ব।
এ জাতীয় আরো খবর..