শামিমুর রহমান জিসান
আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা চরম দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ায় নবনির্মিত ‘সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষা বঞ্চনার অবসান ঘটল এই অঞ্চলে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং আলীকদম উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে নির্মিত এই বিদ্যালয় দুর্গম সীমান্ত এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি স্থানীয় উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের সমন্বিত প্রয়াসের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
উল্লেখ্য, বিদ্যালয়টি আলীকদম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে এবং মিয়ানমার সীমান্ত থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক দুর্গমতা ও যোগাযোগ সংকটের কারণে পাহাড়ভাঙ্গা পাড়াসহ আশপাশের ফাতরাপাড়া, মাসখুম পাড়া ও তরণী পাড়ার শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার ন্যূনতম সুযোগ থেকেও বঞ্চিত ছিল। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতেই এই মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়।
উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে জোন কমান্ডারের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ব্যাগ, বেঞ্চ, পাঠ্যবই ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি শীতের প্রকোপে কষ্টে থাকা ১১৩টি অসহায় পরিবারের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয় এবং মানবিক সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।
এছাড়া বিদ্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ মেডিকেল টিম দুর্গম এই জনপদে দুই দিনব্যাপী বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করে। ক্যাম্পে ৯৫ জন পুরুষ, ১৭৫ জন নারী ও ৪৫ জন শিশুসহ মোট ৩১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জোন কমান্ডার আশিকুর রহমান আশিক বলেন,
“বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শান্তি, সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা সর্বদা জনগণের পাশে থাকব।”
বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মনজুর আলম বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এই দুটি খাতই একটি জাতির টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষ যেন শিক্ষার আলো ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে লক্ষ্যেই উপজেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একটি শিক্ষিত প্রজন্মই পারে সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে, আর সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বয়ে পাহাড়ের প্রতিটি শিশুর হাতে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।”
সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসনের এই সমন্বিত মানবিক উদ্যোগ দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সীমান্তবর্তী এই এলাকায় বিদ্যালয় স্থাপন ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুধু শিক্ষার আলোই ছড়াবে না, বরং পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি জনপদে সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক বন্ধন ও টেকসই উন্নয়নের ভিত আরও দৃঢ় করবে।
এ জাতীয় আরো খবর..