লেখক: পরিতোষ বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
সাংবাদিকতা আজ কেবল খবর পরিবেশনের কাজ নয়; এটি সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশনা, ক্ষমতার জবাবদিহির পথ, জনগণের অধিকার রক্ষার হাতিয়ার। প্রতিদিনের প্রাত্যহিক ঘটনাগুলোর আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে, সাংবাদিকতা সেই মুখোশ সরিয়ে সত্যকে মানুষের সামনে মেলে ধরে। কিন্তু আজ প্রশ্ন বাড়ছে—কি আছে এই সাংবাদিকতায়? সাংবাদিকতা কার জন্য? অপ–সাংবাদিকতা কেন বাড়ছে? সমাধানই বা কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলেই দেখা যায়—সাংবাদিকতা এখনও সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রভাবশালী ও কার্যকরী একটি মাধ্যম।
কি আছে এই সাংবাদিকতায়?
১) সত্য বলার স্বাধীনতা
সত্য প্রকাশ করার ক্ষমতা সাংবাদিকের হাতে থাকে। কোনো রাজনৈতিক চাপ, কোনো ক্ষমতার বলয় বা কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব এ স্বাধীনতাকে দমিয়ে রাখতে চায়; কিন্তু পেশাদার সাংবাদিক তার বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। এই সত্য বলার শক্তিই সাংবাদিকতার আসল সৌন্দর্য।
২) মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ
একজন সাংবাদিকের কলম বা ক্যামেরা বহু মানুষের জীবন পরিবর্তন করতে পারে।
কোথাও অন্যায় হলে, কোনো পরিবার বিপদে পড়লে, কোথাও জনসেবা বন্ধ থাকলে — সাংবাদিকের একটি রিপোর্ট প্রশাসনকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
এ কারণেই সাংবাদিকতা মানুষকে কাছ থেকে জানার এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য সুযোগ দেয়।
৩) প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার আনন্দ
এই পেশায় কোনো দিনই একই রকম নয়।
আজ আপনি রাজনৈতিক সমাবেশে, কাল আপনি পাহাড়ধসের স্থানে, পরশু হয়তো বন্দর, হাসপাতাল বা আদালতে।
ঘটনা পরিবর্তন হয়, স্থান পরিবর্তন হয়, মানুষ পরিবর্তন হয়—সাংবাদিকতা তাই সবসময় চ্যালেঞ্জিং, সক্রিয় ও জ্ঞানের বিস্তার ঘটায়।
৪) সমাজকে বদলে দেওয়ার শক্তি
একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট দুর্নীতিবাজদের মুখোশ খুলে দিতে পারে।
একটি মানবিক সংবাদ সাহায্যের স্রোত বইয়ে দিতে পারে।
একটি সত্য প্রকাশ রাষ্ট্রকে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারে।
সামাজিক পরিবর্তনের এই শক্তি সাংবাদিকতাকেই আলাদা করে তোলে।
কার জন্য সাংবাদিকতা?
১) জনগণের জন্য
সাংবাদিকতা মানুষের কথা বলে—তাদের সমস্যা, তাদের অধিকার, তাদের আশা–আকাঙ্ক্ষা।
একজন সাধারণ মানুষের কষ্ট, অন্যায়ের শিকার হওয়া, বা ন্যায়বিচারের দাবিকে সাংবাদিকতা সামনে আনে।
তাই সাংবাদিকতা মূলত জনতার জন্য, জনতার অধিকার রক্ষার জন্য।
২) রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের জন্য
সঠিক তথ্য রাষ্ট্রকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। একটি সেতু ভেঙে পড়লে, কোনো হাসপাতাল সেবাহীন হলে, শিক্ষা–ব্যবস্থায় অনিয়ম হলে—সাংবাদিকতার মাধ্যমেই এ সবই রাষ্ট্রের নজরে আসে।
নীতিনির্ধারকরাও অনেকসময় সাংবাদিকতার ওপর নির্ভর করেন বাস্তবতা জানতে।
৩) ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য
আজকের সংবাদই আগামী দিনের ইতিহাস।
সাংবাদিকেরা সময়ের সাক্ষী হয়ে ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সত্যের আলো পেতে ব্যবহার করে।
সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য
সাংবাদিকতার সবচেয়ে মৌলিক উদ্দেশ্য হলো—
সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে রুখে দেওয়া।
জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা,ঘটনাকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা
,সমাজে সঠিক মূল্যবোধ গঠন করা,ন্যায়–অন্যায় বোঝার চর্চা তৈরি করা,জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা, উন্নয়ন ও সমস্যা দুটোই দৃশ্যমান করা
এক কথায়, সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য—সমাজকে সত্যের আলোয় দাঁড় করানো।
অপ–সাংবাদিকতা: কেন বাড়ছে?
আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যের বন্যা চলছে। যে কেউ মোবাইল হাতে তুলে লাইভ করতে পারে, সংবাদ বানিয়ে পোস্ট করতে পারে, নিজের মতামতকে খবর বলে চালাতে পারে। এর ফলে সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক খবর ছড়িয়ে পড়ে—যা বাস্তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তির জন্ম দেয়।
অপ–সাংবাদিকতা বাড়ার প্রধান কারণগুলো হলো—
তথ্য যাচাই না করা,ক্লিক বাড়ানোর দৌড়
,রাজনৈতিক পক্ষপাত, আর্থিক লোভ, সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণের অভাব,ব্যক্তিগত স্বার্থে ভুয়া প্রচারণা
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—অসচেতন পাঠক অনেক সময় বুঝতেই পারে না কোনটা সত্য, কোনটা সাজানো।
অপ–সাংবাদিকতা দূর করতে করণীয়
১) কঠোর ফ্যাক্ট–চেকিং ব্যবস্থা
প্রতিটি সংবাদ প্রকাশের আগে উৎস যাচাই, তথ্য মিলানো এবং প্রমাণ সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা।
২) সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ
তদন্তমূলক রিপোর্টিং, ডিজিটাল নিরাপত্তা, আইনি কাঠামো, নৈতিকতা—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।
৩) নিজস্ব নীতিমালা শক্তিশালী করা
প্রতিটি মিডিয়া হাউসকে নিরপেক্ষতা, বিজ্ঞাপন ও খবর আলাদা রাখা, স্বার্থ–সংঘাত নিষিদ্ধকরণ—এসব নিয়ম কঠোরভাবে মানতে হবে।
৪) পাঠকের সচেতনতা বাড়ানো
যদি পাঠক সত্য–মিথ্যা আলাদা করতে পারে—ভুয়া খবরের বাজার নিজে থেকেই কমে যাবে।
৫) পেশাজীবী সংগঠনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
অপ–সাংবাদিকতায় জড়িত হলে সদস্যপদ বাতিল, সতর্কীকরণ, ব্ল্যাকলিস্ট—এসব পদক্ষেপ নিতে হবে।
৬) নতুন প্রজন্মকে নৈতিক সাংবাদিকতা শেখানো
যারা সাংবাদিকতায় আসছে—তাদের নৈতিকতা, মানবিকতা, তথ্য যাচাই পদ্ধতি এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দেওয়া জরুরি।
চট্টগ্রাম দেশের এক প্রান্তে হলেও সংবাদপ্রবাহের কেন্দ্রে থাকে সবসময়।
বন্দর কার্যক্রম, পাহাড়ধস, লোড–আনলোড, শিল্পাঞ্চল, ল্যান্ড পোর্ট, আইন–শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক উত্তাপ—একটি শহরে প্রতিদিন এত বৈচিত্র্যময় ঘটনা ঘটে যে সাংবাদিকদের এখানে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়।
চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের কাজ কঠিন, কারণ—
দ্রুত তথ্য সংগ্রহের চাপ,ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা কাভারেজ,সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জটিলতা,রাজনৈতিক সমীকরণ, ঘনঘন ব্রিফিং ও ফিল্ড রিপোর্টিং
একজন চট্টগ্রামের সাংবাদিক প্রতিদিন বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে সত্য তুলে আনেন—এটাই এই শহরের সাংবাদিকতার সৌন্দর্য ও কঠোরতা।
“একটি তদন্তমূলক রিপোর্টে বন্দর এলাকায় দীর্ঘদিনের দুর্নীতি সামনে আসে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয় এবং কয়েকদিনের মধ্যেই নতুন নীতিমালা তৈরি হয়। সাংবাদিকের সাহসী ভূমিকার কারণেই সাধারণ মানুষ ন্যায্যতা পায়।”
“কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই প্রথমে নিউজ দিতে হবে—এটাই সফলতা।”
→ এ ধরনের মানসিকতা সাংবাদিকতাকে দুর্নামে ডুবিয়ে দেয়।
সাংবাদিকতা তাদের জন্য—
যারা সত্যকে ভালোবাসে, মানুষের পাশে দাঁড়ায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস রাখে এবং সমাজকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে চায়।
অপ–সাংবাদিকতা যতই বাড়ুক, সত্য ও নৈতিকতার পথে থাকা সাংবাদিকরা সমাজ ও ইতিহাসে চিরকাল আলাদা হয়ে থাকবেন।
এ জাতীয় আরো খবর..